ভাটিয়ারী : পাহাড় আর হ্রদের জীবন

আজ ছুটির দিন ছিল। ছুটি বলতে কাজের ছুটি। রাজুকে বললাম চলে আয়। এই দিন আসতে আবার ছয় দিন। আমি একে খান থেকে গেছি ভাটিয়ারী। ও আগেই হাজির। রাজু থাকা মানে আমার সব চিন্তার শেষ। আমার নতুন করে বন্ধু না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। ওর মত দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাইনি যে আমার সাথে পাগলামো গুলো করতে রাজি।

ভাটিয়ারী থেকে বড় দীঘি পাড়ের দিকে যে পথটা চলে গেছে সেটা বহুদিনের চেনা। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী বিএম গেট থেকে পূর্ব দিকে গেছে রাস্তাটা। কতক্ষণ পর পর আর্মির গাড়ি আসছে। সিএনজি আর উচুঁ ছাউনিওয়ালা কিছু গাড়ি চলে এ পথে। আমাদের হেটেই যাওয়ার কথা।

অল্প কিছুদূর যেতেই একটা ব্রিজ। নীচ দিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম ট্রেনের লাইন চলে গেছে। পথটা ওখান থেকেই একেঁবেকেঁ চলে গেছে পাহাড়ের ও পাড়ে। এক কিলোমিটার ভেতরেই যেতেই আর জনবসতির দেখা পাওয়া যাবে না। দোকানপাট ও আর নেই। বিএমএর ফটকে বেশ কিছু আর্মি দাড়িয়ে। বাম পাশে একটা পুরোনো ট্যাংক প্রতীক হিসেবে রাখা। সংরক্ষিত জায়গা হাবার কারণে ছবি তোলাও গেল না। এই বিএমএ হলো সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অফিসার-ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা থেকে স্থানান্থর করে নিয়ে আসা হয় এখানে।

মিলিটারি একাডেমীর মূল ফটক থেকে রাস্তাটা বেশ উচুঁতে উঠেছে। ওখানেই সানসেট পয়েন্ট। বসার জন্যে ছাতার নিচে অনেক চেয়ার টেবিল পাতানো। সাথেই আছে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত খাবার দোখান। ওখানে থেকে বঙ্গোপসাগরের বিশালতা চোখে পড়ে। আমরা যখন গেছি রোদ তখনো তেজ চড়াচ্ছে। বঙ্গোপসাগর যেটুকু দেখা যায় তাতেই ভাবছি কাউকে পাশে নিয়ে সমুদ্র দেখলে কি আসলে তাকে দেখা হতো এই সাগরকে বাদ দিয়ে? পাহাড় চূড়োয় এই শান্ত পরিবেশে হালকা বাতাসে অনেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসছে। এমন পরিবেশে মাঝে মাঝে আড্ডাার ও তো দরকার আছে নাকি। সানসেট পয়েন্ট থেকে দক্ষিণে গেলে তিনটে রাস্তা গেছে। কোনটাতেই যাওয়া যায় না। বিশাল পাহাড়ের বেশিরভাগই আর্মির কাছে চলে গেল। আরো কত রুপ লুকিয়ে আছে তা দেখার সুযোগ পেতে আর্মিতে গেলে মন্দ হতো না।

আমাদের হাটতে হবে আরো অনেকদূর। রাস্তা অনেকটা উঁচুতে হওয়াতে অন্য পাহাড়কে ক্ষুদ্রতা চোখে পরছিল। দুপাশেই পাহাড়ের মাঝখানে হ্রদ। কোথাও চার পাঁচটা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে পানির ধারা চলে গেছে অনেকটা পথ। কয়েকটি পয়েন্টে বরশি বসানোর ব্যবস্থা রেখেছে সেনাবাহিনী। একদিন বরশি বসাতে গুণতে হবে ৬০০ টাকা।

৬০০ টাকার কথা বাদ। এই হ্রদে যেভাবে ঋতু বদলালে রুপ বদল করে তাতে মুগ্ধ হয়ে আমি কিনে নিতেই রাজি। পানি শুকিয়ে আসছে। পাহাড়ে পাহাড়ে দূরত্ব ও বেড়ে যাবে। শীতের আগমনে কি পাহাড়ের মন খারাপ হয়? পানিও বা লুকোয় কোথায়? পাহাড়ের যে সারি চলে গেছে উত্তর পূর্ব দিকে তার ও বা শেষ কোথায়?

উঁচু থেকে বেশ কয়েকজন মানুষকে বরশি বসাতে দেখে জঙ্গলের মত রাস্তা দিয়ে নিচে নেমে যাই। তিনজন এসেছেন শহর থেকে। মাছ খু্ব একটা আটকায়নি। তাতে কি? এই পাহাড়ের দেশে কি কেউ আর মাছ না পেলে মন খারাপ করতে পারে? ঝোপঝাড়ে বহুদিন পর হাটতে গিয়ে চেনা অচেনা কত গাছ আর লতাপাতা চোখে পরল। নাগরিক ব্যস্ততায় এরা কত পর হয়ে গেছে।


ওই পাহাড়ের পরের পাহাড়ের যে লেক আছে সেখানে বোটে ঘোরার সুযোগ আছে। বেসরকারী তত্ত্বাবধানে হওয়াতে খরচ ও অনেকটা বেশি। তারপর আরো ৪/৫ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে শুধু নীরবত। কিছুক্ষণ পর পর দু একটা গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলছে। নীচু রাস্তা থেকে রাস্তাা যখন উপরের দিকে যাওয়া রাস্তা গুলো স্বর্গের রাস্তার মত। স্বর্গের রাস্তা কি আর এমন সুন্দর?

এটুকুর মধ্যেই হাতের বাম পাশে আছে গলফ ক্লাব। সাধারণের প্রবেশের কোন সুযোগ নেই্। মাঝে মাঝে এসব প্রবেশিধাকার না পাওয়ার ক্ষোভে অসাধারণ হয়ে উঠার ভাবনাও মাথায় আসে। সে ভাবনটা অবশ্য বাদ দিতে হয় আরো সামনে গিয়ে। আর্মি নিয়ন্ত্রিত একটা পার্ক করেছে। ক্যাফে২৪ নামটা কি করে এলো জানা নেই।

রাস্তার পাশে একটা পুকুর। তার চার পাশে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোথাও গাছের সাথে বেঁধে দোলনা বানানো হলো। পুকুরে বোট নিজেই চালিয়ে ঘোরা যাবে ওই অনেকটা বেশি খরচ করে। ট্রেনের মত বগি করে একটা গাড়িও বাচ্চাদের জন্যে করা হয়েছে। বিকেলে তখন শেষের দিকে। পুকুরের চারপাশে ছোট ছোট গাছের কারণে ভাল লাগাটা বাড়ে। মূল ফটক হয়ে ঢুকতেই আছে খাবার দোকান।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা ট্যাংক ও সাজানো সামনে। তার পাশেই টিলাতে বাংলাদেশ আর্মির ফিল্ড একশনের কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পুকুরকে ঘিরে এই বিনোদন পার্ক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর সাথে বাড়তি আকর্ষণ যুক্ত করেছে উপজাতি ঘরগুলো। বাঁশের তেরি ঘর গুলো দেখে জানা যাবে বাংলাদেশের উপজাতির ঘর দেখতে কেমন। তার সাামনের পাহাড়ে আছে এডভেঞ্চার ট্রেল। লোহার শিকলেল উপর দড়ি ধরে যাওয়ার একটা ব্যাপার। ওদিকে আর যাওয়া হয়নি।

বিকেল শেষে তখন সন্ধ্যা। আলো আছে আলো নেই মত অবস্থা। পুকুর পাড়ে বসে আছি। ভাবছি এরকম ছুটির দিন কেন রোজ হয় না?


Post a Comment

0 Comments