শুভেন্দু সাহা স্যার ও কক্সবাজার

আমার প্রথম কক্সবাজার যাওয়া খুব ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে। দ্বিতীয় বার যাওয়াটা কলেজে থাকার সময়ে হলেও মামার হাত ধরে যাওয়াতে নিজের স্বাধীনতা না থাকায় সেই অবুঝ বাচ্চার মতোই কি দেখেছি না দেখেছি চলে আসতে হলো। তাহলে আমি তো কক্সবাজার যাইনি বলা যায়! বিদ্যালয়ে গিয়ে যদি বারান্দায় হেটে চলে আসি পাস করা হয়?

মাঝখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজে যাওয়াতে কক্সাবাজার গেলেও ঘুরে দেখা হয়নি। মানে তিনবার কক্সবাজার গিয়েও একবার ও যাওয়া হলো না।

তারপর অনেকবার আমি আর রাজু ভেবে আসছি কক্সবাজার যাব। সময়ের চেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাড়াত টাকা। তাই কাজ ছাড়া কক্সবাজার যাওয়ার ও কোন সুযোগ হয়নি এত বছর। গত ডিসেম্বরে ঠিক হলো আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে কক্সবাজার যাব। এবার ও আগের সমস্যা থাকলেও তানজিলার কারণে আমিও রাজি যাব এবার। কিন্তু তাও মনের মধ্যে পুরো সন্তুষ্টি নেই। বাবার হাত ধরে, মামার হাত ধরে যে কক্সবাজার ভাল লাগে নি শুধু নিজের মত ঘোরা যায়নি তাই সেই কক্সবাজার আবার ডিপার্টমেন্ট থেকে স্যারদের সাথে গিয়ে কোন মজা কি হবে?

এর উপর আমার স্কুল, কলেজ মানে কোন প্রতিষ্ঠান থেকেই বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়া হয়নি। ওই একি সমস্যা ছিল। যা হবার হবে ভেবে আমি ও খুশি হতে চেষ্টা করলাম। সকাল আটটায় আমরা হাজির হই ওয়াসা মোড়ে। তামান্না এলো তারপর তানভীর এলো রাহিন আপু, জাহেদ ভাইয়া। হামিদ শায়লা শাকিল মেরি অনিক বাবার সাথে তানজিলা।

বাস ক্যাম্পাস থেকে ছাড়তে দেরী হওয়াতে প্রথম খারাপ লাগছিল। কিন্তু এতে ভাল হলো আমাদের রোকসানা মহিলা কলেজের পুর্ণমিলনীতে বান্ধবীদের সাথে দেখা করে বাস ধরতে পারল। নয়ত বেচারী ঠিক করেছিল একাই যাবে কক্সবাজার।

শীতকাল বাসে জানালার পাশে সিট আর বাতাস এ তিনটেই আমার আনন্দের জন্যে যথেষ্ট ছিল। তার উপর উয়িন এর নাচ তো ছিলই। মাঝখানে ঘুমিয়েও গেছি। বাস থামল ডুলাহাজারা সাফারী পার্কে। পার্কে ঘোরার সুযোগ হলো না সময়ের স্বল্পতার কারণে। খাওয়া শেষে বাস আবার কক্সবাজারের পথে।

শাকিল পাশে থাকাতে কক্সবাজারের অনেক স্থাপনা দেখাল। ওর নিজের গল্পও শুনাল। কত বছর বাড়ির বাইরে আছে। অন্ধকার নামার পরেই আমরা পৌছলাম কক্সবাজার। যে হোটেলের সামনে বাস থেমেছে সেখানেই আমি দু মাস আগে ছিলাম। আরো কাূকতালীয় ভাবে যে রুমে তখন ছিলাম সেই রুমেই ছেলেদের থাকার জায়গা হলো। বারান্দায় বসে মিস করলাম জয়নাল ভাইয়াকে। এই বারান্দাতেই বসেছি গতবার আমরা।

রুমে যেতেই আমি অস্থির হয়ে উঠেছি সমুদ্রে যাওয়ার জন্যে। কিন্ত ততক্ষণে বাকীদের প্রস্তুতি শেষ হয়নি। যেই না আমরা সবাই সমুদ্রের কাছে গেলাম অমনি ফিরতে হলো স্যারের কলে। আমি সেই স্বাধীনতাহীন পরিবেশ আবিষ্কার করলাম। সাথে বাকীরাও। খাওয়া পর্ব শেষে আমরা এবার সমুদ্রে। এবার অবশ্য সময় বেঁধে দেয়া এতটার মধ্যে ফিরতে হবে। যাক বাবা তাও তো যাওয়া যাচ্ছে নাকি! তখন রাত আটটা মত হয়ে গেছে।

জোয়ার না থাকাতে বালুচর অনেকটা ভেতরে চলে গেছে। পানি ছুঁতেই যেতে হলো অনেক দূর। রাহিন, পৌষি ও সুমাইয়া আপুর সাথে হাটছিলাম। পৌষি আপুর সাথে এই ট্যুরেই পরিচয় হলো। হাটতে হাটতে একবার উত্তরে আরেকবার দক্ষিণে হাটতেই ফেরার সময় হলো।

রাতের বেলা হওয়াতে মানুষের আনন্দ চোখে পরছিল না তেমন। আবার ভীড় ও শব্দের কারণে খুব একটা ভাল ও লাগছিল না। ঢেউ আছরে পরার শব্দও তেমন নেই। রাহিন আপুর সাথে গেলাম মার্কেটে। আমি ঘুরে ঘুরে দোকানের ছবি তুললাম। হোটেলে ফিরে খেয়ে মন খারাপ হলো। এবার বুঝি ঘুমাতেই হবে রুমে!

একটু পর জানাল স্যার একটা জায়গাতে নিয়ে যাবেন। সবার সাথে হাটতে হাটতে দেখি সমুদ্রেই নিয়ে গেল স্যার। তাও রাতে। শুভেন্দু স্যারের সাথে কথা বলতে বলতে গেছি। অনেকক্ষণ কথা বলার পর সাইফুল স্যার বললেন আমরা বালিতে বসব। ঝাউবাগানের পাশে একটা খুঁটিতে লাগানো আলো গিয়ে পরছে পুরো বালুচরে। আমরা সেখানেই বসে পড়লাম গোল হয়ে। স্যার কথা বলছিলেন। আমরা ও বলছিলাম। কথা বলতে বলতে মধ্যরাত।

ততক্ষণে মনে হলো আমার এবার কক্সবাজার দেখা হয়ে গেছে। এত রাতে সমুদ্রে একা এলে কখনো থাকা যেত না। আমরা যখন আবার এলাম ঢেউ চলে এসছিল খুব কাছে। তাই কথা বলতে বলতেই শুনছিলাম ঢেউয়ের আছড়ে পরার শব্দ। রাতের নীরবতা সব আরো ঘিরে ধরেছে পুরো সমুদ্রকে। মাঝে মাঝে ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। বিচেও মানুষের সংখ্যা কমে এসছে। স্যাররা সমালোচনা শোনার একটা মানসিকতা তৈরি করে দিলেন সবার ভিতর। আমার ভেতর তো অবশ্যই।

শুভেন্দু স্যার ভাষা বিজ্ঞানের প্রতি প্রেমের কথা জানালেন। এতেও মুগ্ধ মন। ততক্ষণে রাত শেষ হওয়ার বাকী দু আড়াই ঘন্টা। ফিরলাম হোটেলে। কক্সবাজার দেখার আনন্দেই ঘুম এসে গেল দ্রুত। পরদিন আবার সমুদ্রে। ঢেউয়ের মধ্যে নেমে পরেছি সবাই। বহু বছর পর ইচ্ছে মত গোসল করা গেল। সাথে সর্দি লাগানোও । ততক্ষণে ঠিক করে নিয়েছি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেড়ানোর কথা হলে আর কোন কনফিউশন নয়। আমি আসবই। স্বাধীনতাহীনতার দেয়াল তো ভেঙ্গেই পরেছে বহু আগে।

গোসল শেষে অনেকটা আগেই চলে এলাম হোটেলে। খাওয়ার পর গেছি র‌্যাডিয়ান্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড দেখতে। পুরোটাই মাছের সংগ্রহশালা। অবশ্য মাছ দেখাতে খুব একটা মনোযোগ ছিল না। ছবি তুলতেই তুলতেই বেরিয়ে পরেছি ওখান থেকে। গুহার মত করে বানানো হয়েছে এটা। কোথাও মাথার উপরে হাতের ডানে পাশে কাচের জারের ভেতর সব মাছ। কৃত্রিম ঝর্ণাও বানানো হয়েছে ভেতরে। মাছের নাম গুলোও এলোমেলো করে রাখা তাই খুব একটা আকর্ষণ করতে পারেনি।

বেরোনোর পর স্যারদের সাথে একত্রে ছবি তুলে হোটেলের ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফেরার পালা। বাসে উঠার পর মন খারাপ। এত দ্রুত সময় চলে যায় কেন! সব কিছুতেই শুধু শেষের সময় চলে আসে। প্রথম দিন আসার সময় তোলা ছবি গুলো দেখছিলাম। তারপর ভাল লাগল শুভেন্দু স্যারের কথা শুনে। জীবন দর্শনের নানান কিছু স্যার আলোচনা করলেন। আলোচনা নয় গল্প বলার মতনই। স্যার আমাদের ক্লাস নেননি কিন্তু অনেক কিছুর পাঠ তো ক্লাসের নির্দিষ্ট সিলেবাসের ভেতর দেয়া যায় না। স্যারের সব কিছুকে বাস্তবিক অর্থে চিন্তার ব্যাপারটা ভাল লাগল। আবেগের ফাঁকা বুলিকে নিয়ে বেঁচে থাকা তো জীবন নয়।

বাস যখন আসল নতুন ব্রিজ তখন রাত ১২টা পেরিয়েছে। কর্ণফুলীর বুকে অনেক জাহাজ আর ছোট নৌকায় আলো জ্বলছে। বাসে আমাদের কজন যুদ্ধ করছিল চিটাগং ও বাইরের জেলার মানুষ নিয়ে।

আমার আবার ভীষণ আনন্দ হলো। আমরা ব্ন্ধুবান্ধব সবাই একসাথে মজা করছি কেউ কোথাও বাধা দেয়ার নেই। কেউ নেই চোখ রাঙানোর কিংবা নেই পুলিশি হয়রানি। জীবনের আনন্দ তো এখানেই। স্বাধীনতার স্বাদও এখানেই। মানুষ আনন্দেই বাঁচতে চায়। প্রশ্নের মুখে জর্জরিত হয়ে আতঙ্কিত হয়ে থাকার জীবন তো সারা জীবনই। কোথাও নিজের কাছে কোথাও আশে পাশের মানুষের কাছে। কিন্তু নিজের মত করে সময় নিয়ে পৃথিবীকে দেখতে একটু সময় অন্য কোথাও অন্য কোনখানে কাটানো খুব খুব জরুরী।

আমার প্রথম বার মনে হলো একটু আধটু সমস্যা থাকলেও সবার সাথে বেড়ানো একা বেড়ানোর মতই আনন্দের । এতে ক্ষতির কিছু নে!

তাই তোমরা, আপনারা যারা ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্যুরে যেতে চাওনা/চাননা তাদের বলব তোমরা মিস করো কত কিছু! তাও কি কি মিস করো আমি লিখে বোঝাতে পারব না।

যদি বলো কেন যাবে ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্যুরে তার সাতটা কারণ দেখাতে পারি।

প্রথমত নিজের ভেতর অস্থিরতা কমানোর জন্যে। এই যেমন আমি হোটেলে গিয়েই বিচে যাওয়ার জন্যে প্রথমদিন অস্থির হলাম কিন্তু পরে তা আর হইনি। শিখেছি অস্থরিতা নিজের একার দলের নয়।

দ্বিতীয়ত স্যারদের নিয়ে নানান ভুল ধারণা থাকে। আমারও ছিল। এই যেমন আমি যদি ডিপার্টমেন্ট থেকে বাইরে যাওয়ার জন্যে রেফারেন্স লেটর চাই ভুল ভাববে। মোটেই তা ভাবেননি স্যাররা!

তৃতীয়ত সিলেবাসের বাইরে নানান প্রশ্ন থাকে যা ক্লাসে করার সুযোগ নেই। ট্যুর ভাল সুযোগ।

চতুর্থত ক্লাসেও স্যাররা সময়ের কারণে অনেক কিছু বলতে পারেন না। ট্যুর অনেক নতুন কিছু শোনার সুযোগও দেয়।

পঞ্চমত নতুনের ভিতর আনন্দ আছে। এই যেমন আমি কাল একদম নতুন অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেছি কারণ আমি তো আগে এত জনের সাথে কোথাও যাইনি।

ষষ্ঠত নিজেদের ভেতর দূরত্ব কমানো। এই যেমন শাকিল সহ কয়েকজনের ব্যাপারে প্রেজুডিস আমার আর কাজ করবে না।

সপ্তমত কোন কারণ ছাড়াই ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্যুরে যেতে পারেন। নানান রকম ভাল দিক আছে তার তা ট্যুর থেকে আসার পর বুঝতে পারবেন।

এলবামের নামের সাথে স্যারের নামটাও থাকছে কারণ আমার এই ট্যুরে সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে স্যারের কথা। ছাত্রদের প্রতি স্যারের ভালবাসা। হাইস্কুল পেরোনোর পর আর কোন স্যারের সাথে এভাবে কথা বলা হয়নি! সুযোগ হলে স্যরের নতুন কর্মস্থলেও যাওয়া যাবে।

স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর সোহান স্যারের প্রতিও। স্যার আগ্রহ না জাগালে আমিও মিস করতাম সব।


Post a Comment

0 Comments