সমুদ্র কি শুধু কক্সবাজার?

খুব ছোট বেলায় কোন এক মাহফিলে হুজুর বলেছিল মানুষ যখন মরার পর শেষ বিচার যেদিন হবে সেদিন মানুষ আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করবে দুনিয়াতে আরেকবার আসার সুযোগ দেয়ার। যাতে সে সব শুদ্ধ করে করতে পারে এবার জান্নাতে যেতে পারে। না সে দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না। ঠিক অমন একটা দ্বিতীয় সুযোগ পেয়ে স্বেচ্ছায় ইমপ্রোভ পরীক্ষা দিতে গিয়ে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ১৫ দিন। আজ ছিল মুক্তির দিন। স্বাধীনতার দিন।

ওদিকে রাজুর শহরে কাজ থাকাতে হাজির হলো জিইসি। কোথায় যাব যেহেতু আগের প্লান নেই তাই আমরা হেটে চলে যাই ওয়াসা। তারপর ঠিক হলো বড়পোল হয়ে চৌচালা বিচে যাব। কিন্তু দেওয়ানহাট আসতেই রাজু বলল দেওয়ানহাট এসে গেছি। নেমে পরে আবার উঠে পরলাম নয়বাজারের বাসে। ফইল্যাতলী বাজার থেকে আবার হেটে এবার হালিশহর বিচে।

ফইল্যাতলী থেকে পশ্চিমে গেলেই মনে হয় আমার গ্রামে চলে এসছি। বাংলার শেষ এই ভূখন্ডের পশ্চিম সীমান্ত পুরোটাই বঙ্গোপসাগরে ঘেরা। আমার নানু বাড়ি থেকে এই বিচ খুব একটা দূরে না। কিন্তু কখনো তাদের কাউকে আসতে দেখিনি। তেমন একটা আগ্রহ কাছাকাছি কারো নেই। কিন্তু কক্সবাজার বললে সমুদ্রে যাব একটা ব্যাপার সবার মধ্যে কাজ করে। এর একটা কারণ আমি আবিষ্কার করছি বিষয়টা আসলে সমুদ্র প্রেম নয়। সবাই কক্সবাজার যায় আমরাও যাই ওখানে ভাল হোটেল, খাবার আর মার্কেটের ও সুযোগ থাকে। তাছাড়াও জনপ্রিয় যা নয় তার প্রতি সাধারণ আগ্রহ আসবেই বা কেন?

যাক যেটা বলছিলাম বাংলার এই শেষদিকের পশ্চিম সীমান্ত পুরোটাই ঘিরে ধরেছে বঙ্গোপসাগর। মানে সেই ফেনী থেকে মেঘনা যেখানে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে সেখান থেকে টেকনাফ কিংবা সেন্টমার্টিন পুরোটাই বঙ্গোপসাগর ঘেরা। তাহলে এই বিশাল উপকূল জুড়ে আছে এমন হাজারো বিচ। কিন্তু খুব একটা নামডাক নেই অন্য গুলোর। ইদানীং আমার এলকাার বাঁশবাড়িয়া বিচ, কুমিরা বিচ আলোচনায় আসছে।

অত ভাবতে ভাবতে আমরা বন্দরের পণ্য আনা নেয়ার যে রেলপথ আছে সেটা পার হয়ে চলে গেছি খোলা মাঠের ভেতর। এ জায়গাটা সাগরিকা স্টেডিয়ামের ঠিক পরেই। ওখান থেকে আরো অনেকটা হাটার পর বন্দরের হাইওয়ে তারপরেই বেড়িবাঁধ।

নতুন রাস্তার কাজ চলছে। যতটা জানি এই রাস্তা যাচ্ছে মীরসরাই ইকোনমিক জোন অবধি। রাস্তার ঠিক পাশেই অনেক বড় চড়ে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুকুর। সেখানে চলছে মাছ চাষ। পুকুর না বলে ঘের বলা যায়। দু একটা পুরোনো ঘেরে তালগাছ লাগানো হয়েছে কয়েক পাশে। কিন্তু বেড়া তুলে দেয়াতে যাওয়ার উপায় নেই।

শীতের দিনে সমুদ্র খুবই শান্ত। পানি চর থেকে অনেকটা দূরে থাকলেও কাদার জন্যে সামনে এগোনো মুশকিল। অগ্যতা চলে গেলাম ঝাাউবনে। এবার নতুন জিনিস দেখলাম। স্কুল, কলেজে যারা পড়ে ও যারা গার্মেন্টেসে কাজ করে তারা এই ঝাউবাগানে যেতে পারবে না। টেনশন করতে যাব অমনি রাজু বলল আমরা তো য়ুনিভার্সিটি পড়ি। বেশ বেশ ভেতরে ঢুকে পরলাম।

বেশ কয়েকটা অস্থায় খাবার দোকান জায়গাটাকে বিশ্রি করে তুলল। গ্রাম এলাকাতে বিয়ে হলে যে কাপর গুলো ডেকারেশন থেকে ব্যবহার করে তেমন কাপরে চারদিক ঘেরা দোকান। আমরা আরো ভেতরে চলে গেলাম। পুরো টাই গাছে ঘেরা। কোথাও ছোট ছোট খাদ। আরেকটু ভেতরে গেলেই আর হাটার উপায় নেই। কাদায় শেওলা জন্মেছে। ওগুলো দেখে হাটার লোভ হলো। হাটতে হাটতে এবার কাদার ভয় শেষ। দুর্বল ঢেউ গুলো তখন খুব আস্তে আসছে সামনের দিকে।

এদিক থেকে উত্তর দিকে আরো অনেকটা হেটে যাওয়ার পর বিশাল খাল। খাল আসলে খুব একটা বিশাল হয় না। সমুদ্রের পানি এসে খাল চাপিয়ে ‍দুপাশে উপচে পড়ে চড় ভাসিয়ে দেয়। ফলে এই ছোট খালই হয়ে উঠে সমুদ্রের বিশালত্বের ক্ষুদ্র প্রতিনিধি।

জোয়ারের কুড়ি পঁচিশ হাত ভেতরে গিয়ে একজন পেলন জাল ঠেলছিল। চড়ে বসে একজন চিংড়ির পোনা বাছাই করছে। উনার কোন তাড়া নেই কিংবা বাকী পৃথিবী চাপেও ক্লান্তি নেই। একটা বিড়ি ধরালেন। আমি ছবি তুলে নিলাম। তুলে নিজেই হাসি। আমি নিজের সাথেই কি প্রতারণা করছি। আমি চেয়েছি সমুদ্রের কাছে থাকতে। সমুদ্রের বদলানো দেখতে। সব সময় সমুদ্রের ভেতর থেকে জানতে তাকে। কেন পালিয়ে বেড়াই?

এই পালানোর হলে না আসলেও হতো। কিন্তু সময় তখন গড়িয়ে গেছে অনেক। এবার ফিরতে হবে। ফেরার কথা ভাবলে আবার খারাপ লাগে। কবে আসব আবার এ দিকটা? কিংবা আমার চট্টগ্রাম ছেড়ে আমি কখনো পালালে এই সমুদ্র দেখতে এতটা সুন্দর থাকবে? তাহলে আসা চাই। বারবার আসাতেও ক্লান্তি আসার নয়। ওই চাচার চোখে তো ক্লান্তি দেখিনি!

Post a Comment

0 Comments