চট্টগ্রামের সীমান্তের এদিক ওদিক

পিনাকি দার ওয়ালেই প্রথম ভূমিপুত্র শব্দটা দেখেছি। উনার উপর হামলার পর বলেছেন উনি বগুড়ার ভূমিপত্র।

আমি আমার গ্রামে যাই না বছরের বেশি হলো। মাঝে সাঝে হালিশহর বিচের দিকে সমুদ্র পাড়ে গেলে ঝাউবনের ভিতর হাটার সময় খালি পায়ে হাটি। তখন এই ভূমিপুত্র ব্যাপারটি আরো বেশি অনুভব হয়। যে মাটির উপর হাটছি এই মাটিতেই কত মায়া জমে আছে। ভালবাসা আছে। ভেলোরের উত্তপ্ত ভিন্ন রঙের, বর্ণের মাটিতে পা রেখে সেই ভাল লাগাটা আর পাই না।

তরুণ কবিদের প্রতি আমার এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করে। কিন্তু বড় কবিরা, গীতিকাররা কবিতা, গানে এই মটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার কথা বলেছেন বহু আগে। তাদের সেই বর্ণনা, আকুতি একটা বয়সে বাড়াবাড়িই মনে হতো। পরে ধারণা বদলেছে। এই নিজের মাটিতেই সমাহিত হওয়ার আকুতিটা আমি এখন আরো বেশি ভালভাবে অনুভব করি।

তাই আমার বলতে ভাল লাগে আমি বাংলার সন্তান। বাংলা আমার দেশ। সেই বাংলা সীমান্ত দিয়ে ঘেরা হলেও আমি পুরো বাংলা অঞ্চলকে আমার আপন মনে করি। মাটির টান শেকড়ের টান অস্বীকার করার জো কই?

কাল একটা বিয়েতে গেছি সীতাকুন্ডে। গ্রামের বিয়ের রীতিনীতি গুলোর বিরোধিতাও করেছি এক সময়। কিন্তু যতই দিন যায় আমি সামাজিক রীতিনীতি গুলোতে ভাল লাগা খুঁজে পাই।

কাল ও দেখলাম জামাইকে আটকানো হলো। দুধ মিষ্টি খাওয়ানো হলো গেটে। তাপর টাকা আদায় করা হলো। বিয়েতে আরো কত কি হলো। আমরা ওসব রেখে মানে আমি আমি আর শাহাদাত স্যার বিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে হাটতে গেছি।

রাস্তার এক পাশে ছোট একটা খাল। প্রত্যেকটা বাড়ির সাথে রাস্তার সংযোগ করেছে বাসের সাঁকো নয়তো ছোটখাটো ব্রিজ। তখন তিনটা মতো হবে।

দুপাশেই কোন বাড়ি ঘরে মানুষের দেখা নেই। একটা ভোৗতিক নীরবতা কাজ করে এই সময়। ঘরের পাশেই ক্ষেত। শিমের চাষ হয়েছে অনেক। বিকেল বাড়তেই দেখি ভ্যান গাড়িতে করে শিম তুলে নেয়া হচ্ছে হাইওয়ের দিকে। তখন আরো বিকেল পরার আগেই আমরা চলে যাই ফেনীতে।

ফেনীতে এর আগে কখনো যাওয়া হয়নি। নাদিম ভাইকে পেলাম কুমিল্লা বাস স্ট্যান্ডে। নাদিম ভাইয়ের দুষ্টামিতে সময় কেটে গেল।

ফেনী যেতেই আমার বারবার মাথায় আসছিল ত্রিপুরার কথা। ফেনীই বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করেছে চট্টগ্রামকে। এটা বলার একটা কারণ আছে। ফেনী নদী শেষেই শুরু হয় চট্টগ্রাম। এ পাড়ে ফেনী বা পুরো বাংলাদেশ আর এই পাড়ে একটা মাত্র নদী দিয়ে চট্টগ্রামকে পৃথক করেছে ত্রিপুরা থেকেও। এবং এই বিশাল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের ভাষাও চাঁটগাইয়া। আমার মায়ের ভাষা ও তো এটা। মায়ের বাড়িও এখানে। মায়ের ভাষা মায়ের দেশ তো এই চট্টগ্রামই। তাহলে পুরা বাংলাদেশ থেকে চট্টগ্রামকে আলাদা করে ভাবতেই পারি।

আমার জানার জায়গাটা হলো ফেনীর পূর্ব পাশে থাকা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য কিংবা মিজোরাম রাজ্যের মানুষের জনজীবন কেমন। তাদের ভাষাটা বাংলা হলে সেটা কেমন। ওরা কি আমাদের চট্টগ্রামের ভাষা জানে কিছুটা?। কেনইবা তাদের সাথে আমাদের অত জানাশোনা নেই।

মানে বাংলার ইতিহাস পড়তে গেলে দিল্লী, উত্তরপ্রদেশ, উড়িষ্যা, আসামের কথা আসে কিন্তু চট্টগ্রামের কিছু পড়তে গিয়ে ত্রিপুরা, মিজোরামের কিছুই পেলাম না। অথচ ভারতের এ দুটো রাজ্য আমাদের সাথে একদম লাগোয়া। আমাদের কাছে ভারত মানে বরাবারই হয়ে উঠেছে দিল্লি। দিল্লি কেন্দ্রিক ভারত চিন্তার বাইরে গিয়ে আমার দেখার ইচ্ছে আামাদের পাশের সাত রাজ্যকে।

এমন তো হওয়ার কথা ওখানেও কিছু মুসলিম পরিবার ছিল যারা সাতচল্লিশে পালিয়ে্ এখান চলে আসে কিংবা কেউ ওদিকে যায়। বাংলার সীমান্ত ওখানে না হলেও যুগ ‍যুগ ধরে এই রাজ্য গুলো তো চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিংবা আরাকানের প্রতিবেশীতো ছিল নাকি! পাহাড় আর নদীই আলাদা করেছে এ এলাকা গুলোখে। আমাদের নদী গুলোর বেশিরভাগ চলে গেছে ওদিকেই নয়থ এসেছে ওদিক থেকেই। যেমন কর্ণফুলী এসছে মিজারোম রাজ্যের লুসাই পাহাড় থেকে। এই ফেনী নদী এসছে ত্রিপুরা থেকেই। তাহলে একটা সংযোগ তো আছেই প্রকৃতির। তাহলে দুর্গম এলাকা বলেই কি এতটা অপরিচিত হয়ে আছে এরা?

সে যাই হোক এ বিষয়ক কথা হলোও নাদিম ভাইয়ার সাথে। উনার আর আমার মধ্যে আরো একটা মিল পেলাম। সীমান্তের ও পারে জনজীবন কেমন দুজনের কেউই জানি না।

জয়নাল ভাইয়া একটা চেষ্টা করলেন ঢাকা যাওয়ার। পরে পরিবহন সংকটের পর আমরা চলে এলাম জোরারগঞ্জ। রাতের গ্রামের বাড়িতে আবারো সেই নিঃস্তবদ্ধতার স্বাদ। তারপর গভীর এক ঘুমে সকাল দশটা। উঠেই রোদ ছায়ার ভেতর কিছুক্ষণ তাকানোর পর ফেরার তাড়া।

একদিন সব গ্রাম যদি শহর হয়ে যায় সেদিন গ্রামের এই নীরব পরিবেশ কি জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে?


Post a Comment

0 Comments