গুইল্যাখালী বেড়িবাঁধের পথ ধরে

ছোট বেলায় সীতাকুন্ড উপজেলা সদরে যাওয়া ছিল ঈদ আনন্দের মতন। এও বলতাম সীতাকুন্ডে থাকে কিন্তু সদরে এসে দু চারদিন ঘুরে না সে তো সীতাকুন্ডের বাসিন্দাও না। সম্ভবত তারা সমুদ্রের মাঝখান থেকে মানে সন্দ্বীপ থেকে এসছে। অবশ্য দাদী থেকে জানা গেছে আমার দাদার পূর্ব পুরুষ সীতাকুন্ড এসছে ফটিকছড়ি থেকে।

সীতাকুন্ড সদরে অন্য অনেক ভাল লাগার মধ্যে ছিল রাস্তা থেকেই পাহাড়ের সারি স্পষ্ট দেখতে পাওয়া। ঠিক আজও এত বছর পর সীতাকুন্ড খুব নতুন। বাতাসে ভালবাসার গন্ধ। সেদিন লিজার সাথে বাড়বকুন্ড ভাবীর বাড়ি গেছি।

সিরাজ ভূঁইয়া রাস্তার মাথা থেকে পশ্চিমে অল্প যেতেই আর বাড়ি ঘর তেমন নেই। কোনমতে দাড় করানো একটা রাস্তা বিলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। রাস্তা অল্প এগোতেই চোখে পড়ল একটা দিঘী। পানি একদমই কমে এসছে। দীঘির চারদিকই গাছে ঘেরা।

শহরের জীবনের দ্রুততার কারণে এমন থেমে যাওয়া দুপুর অনেকদিন দেখা হয় না। প্রকৃতির নিজের শব্দ ছাড়া আর কোন কোলাহল ও নেই। দীঘির পশ্চিমদিকে একসাথে অনেক আম গাছ। শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে এমন ভাবে মনে হয় উপরে ছাদ আছে। সেখানে বসলেই দীঘি থেকে চোখ দূরের পাহাড়ে চলে যায়।

প্রকৃতির অদৃশ্য চাদর যখন ঘিরে ধরে নিজের ভেতর বাহির তখন জগতের অন্য সব চাওয়া দিব্যি ভুলে যাওয়া যায়। তখন ভাবছি দুশ্চিন্তার জন্যে যদি বলা হয় নেশা করছি তাহলে সে কথার উল্টোটাও হয়। প্রকৃতির এমন প্রেমের জন্যে দুশ্চিন্তাই আসছে না মনের ভেতর।

বিকেলে আমাদের সাথে এলো রাজু। সদরে যাওয়ার পর একটা মার্কেটের ছাদে উঠে পূর্বের দিকে তাকিয়ে আবারো আফসোসের আগুনে পুড়লাম। জীবন কেন এভাবে ছুটে? যে দুপুরে এই পাহাড়গুলো নিজেদের এমন রুপ মেলে ধরেছে সেই দুপুর কেন রোজ জানালা থেকে দেখা যায় না?

ঠিক হলো এবার গুলিয়াখালী যাব। এই সমুদ্রসৈকত ফেসবুকের প্রচারণার কারণে এতটাই জনপ্রিয় কদিন আগে জনপ্রিয় হয়ে উঠা বাঁশবাড়িয়া সৈকত দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় চলে গেছে।

উপজেলা সদরের নামার বাজার থেকেই সিএনজি সার্ভিস আছে সৈকত অবধি। গ্রামের ভেতর দিয়ে অনেকটা পথ যাওয়ার পর দেখা মিলবে পুরোনো ধাঁঁচের গ্রামের। যেখানে বিকেল মানেই এখনো গরুকে ঘরে ফেরানোর ব্যস্ততা। পাহাড় থেকে নেমে আসা খালের পাশে গড়ে উঠা ঘর গুলোতে কোন ব্যস্ততা নেই। বেশিরভাগই নিজেদের ক্ষেতখামারে চলে গেছে। বিদ্যুত ও নেই সেখানে। স্কুল কলেজ যা আছে সদরে। পড়ার ব্যবস্থা সবার দিনের আালোতে বড় উঠানে। সব মিলে দোকানপাট সহ আধুনিক কিছুই নেই।

এমন অনেক গ্রাম এখনো গ্রাম হিসেবেই টিকে আছে। যদি সব জায়গাতে উন্নয়নের ছাপ পড়ে তাহলে গ্রামের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন খুঁজতে ছুটতে হবে কোন জাদুঘরে।

আরো অনেকটা এগোতেই বেঁড়িবাধ। ছোট একটা দোকানে মাছ ধরার বিভিন্ন জিনিসের পাশাপাশি হালকা নাস্তা রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে দুজন মানুষ এসছেন তাদের ঘিরে রেখেছেন ওখানে থাকা সিএনজিওয়ালা সহ বাকী যারা ঘুরতে এসছে।

স্থানীয় দুজন কথায় কথায় জানালেন, ঢাকা থেকে এসছে যারা তারা বলেছে, উনারা বিদেশেও গেছেন। এরকম সৈকত আর দেখেননি। এটাই নাকি দুনিয়ার সেরস সৈকত।

বলার ভঙ্গি আর আগ্রহ দেখে এমন কথা বিশ্বাস হতে বাধ্য। আসলেই কি উনারা এমন বলেছে নাকি বলেনি তারচেয়ে বড় বিষয় উনাদের সরলতা। কেমন অবলিলায় নিজেদের বাড়ির পেছনের সমুদ্রকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাচ্ছেন। তাদের বেশিরভাগই সমুদ্র দেখতে আসে না। যে সমুদের তীরেই বড় হয়েছে তার কাছে দেখার কিছুই নেই। বরং বেশিরভাগই চিন্তা করে আগতদের কাছ থেকে কিভাবে দু পয়সা আয় করা যায়। কেউ দোকান বসিয়েছে, কেউ গাড়ির সার্ভিস দিচ্ছে, কেউ মালপত্র এগিয়ে দিচ্ছে কেউবা পানি যেতে যেতে নিচু হয়ে যাওয়া জায়গাতে বাঁঁশ দিয়ে হাটার পথ তৈরি করে দু চার টাকা নিচ্ছে।

আমাদের ও যেতে হলো এভাবে। একটা জায়গা নিচু। বৃষ্টির কারণে কাদা হয়ে আছে। লাফ দিয়ে যাওয়াই যায়। ওটার উপরে গাছ দিয়ে উঁচু করে বানানো হলো ব্রিজের মতন। একজন বসে আছেন। টাকা চেয়ে নিচ্ছেন। অন্য দিক দিয়ে যাব বলতেই হেসে দিলেন।

গুলিয়াখালীর সাথে অন্য সৈকত গুলোর মূল ফারাক হলো বেড়িবাঁধের পূর্ব পাশে কোন জনবসতি নেই আর বিশাল বিলের শেষেই সীতাকুন্ডকে আগলে রাখা পাহাড় গুলো দেখা যায় আর পশ্চিমে বেড়িবাধের পরেই চর নেই। কেওড়া গাছের বাগান এতটাই ঘন মনে হতে পারে কোন জঙ্গলে এসে পরলাম কিনা।

ডান পাশে খালের ও পাড়ে এ পাড় দুদিক জঙ্গলের মতন দেখতে। তবে সামনে যেতে যেতে গাছের বন্ধন হালকা হয়েছে। অনেক জায়গাতেই মরা গাছের শেকড়ের জন্যে হাটতে হয় সাবধানে। কাছাকাছি যত যাওয়া যায় সমতল জায়গা আর নেই। ছোট ছোট গর্ত একদম বালুচর অবধি।

বর্ষায় জোয়ার আসার দিনে এই গর্তগুলোতে পানি জমে থাকলে পেলন জাল নিয়ে নেমে যায় ছোটরা। গরমের দিনে গর্ত গুলো দখলে যায় লাল কাঁকড়ার। আমরা আরো উত্তরের দিকে যেতে থাকলাম জঙ্গল পেরিয়ে। ওদিকটায় তেমন কেউ নেই।

বিকেলের আলো তখন আরো কমে এসছে। পুরো জঙ্গল নিস্তব্ধ। অনেকটা পথ যাওয়ার পর আবার খাল এসে পরল। এবার আর সামনে এগোনোর উপায় নেই। ফেরার জন্যে বিল দিয়ে জমি পেরিয়ে আবার বেড়িবাঁধে।

গুলিয়াখালীর উত্তরে জায়গাটার নাম ঘাটঘর। এ দিক থেকে সন্দ্বীপে যাওয়া যায় বলেই এমন নাম। বেড়িবাঁধটাও শক্তপোক্ত। পূর্বে বিল আর পশ্চিমেও নিচু এলাকায় কিছু সবজির চাষ হয়েছে আরো ভেতরটা জঙ্গলের কারণে দেখা যায় না।

বহুদিন পর ধূলোমাখা পথে হাটছি। সন্ধ্যা তখন কাছাকাছি চলে এসছে। দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে শেষ আলো ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বেড়িবাঁধের এ মাথা ও মাথা।

অমন মায়ামাখা সময়ে কোথায় থাকে আর জীবনের যত চাপ, হতাশা। ঠিক রাত নামা অবধি হাটতে হাটতে দেখা হলে ঘরে ফেরা অনেক কৃষকের সাথে। বাড়বকু্ন্ডের দিকে এসে দেখলাম দু পাশেই উন্নয়ন কাজ চলছে। গ্যাস সংক্রান্ত কোন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।

তারপর আর হাটার ইচ্ছে হলো না। সিএনজি ধরে বাড়ির পথ ধরলাম।

ভাবছি কি সীতাকুন্ডে জন্মেছি বলেই এত ভালবাসা? না তাও তো নয়। আমি কি নদীয়ার কল্যাণীতে জন্মেছি? তা তো না। তাহলে কল্যাণীকেও তো বাসি।

আসলে বাসতে ভাল লাগে। এইত সহজ উত্তর।


Post a Comment

0 Comments