চবি : বৃষ্টি যেখানে ভুতুড়ে রাত নিয়ে আসে

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখা হয়েছে একবার। ভর্তির পরে একবার ও দেখা হয়নি বলা যায়। রোজ অনুষদ অবধি যাওয়া ও আবার ট্রেন ধরে শহরে আসাকে যদি বিশ্ববিদ্যালয় দেখা বলা হয় তাহলে ভর্তির পূর্বের আর ভর্তির পরের মধ্যে ফারাক রইলো কই?

কাজ থাকাতে বন্ধের দিনে বাস ধরেই ক্যাম্পাসে যেতে হলো। বন্ধের দিনে বাস ক্যাম্পাস অবধি না যাওয়াতে নামতে হলো ফতেয়াবাদ। ততক্ষণে রোদ সরিয়ে দখল গেছে বৃষ্টির কাছে। হালকা বাতাসের সাথে এই বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার ও কিছু ছিল না। সিএনজি পাওয়ার পর বাড়ল বৃষ্টির তীব্রতা। বৃষ্টিতে তখন পথঘাট ভিজে একাকার। বিশ্ববিদ্যালয় এক নাম্বার গেটে নেমে অ্ল্প হেটে আরেক সিএনজি ধরে জিরো পয়েন্ট। পুরো পথটা এই প্রথম বৃষ্টিতে দেখা। রোদের দিনে, শীতের দিনে অন্য রুপে বদলে যাওয়া এই রাস্তা বৃষ্টিতে যেন জেগে ‍উঠল। খুব একটা গাড়ি না থাকাতে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ ছিল শুধু আর দূরের মাঠে কৃষকদের ঘরে ফেরার তাড়া।

বৃষ্টি এখানে খুব স্বাভাবিক। কারো ভিজে যাওয়ার শহুরে তাড়া নেই।

জিরো পয়েন্ট থেকে যেতে হতো আলাওল হলে কিন্তু বৃষ্টির জন্যে উপায় নেই যাওয়ার। জিরো পয়েন্ট থেকে কাঁটা পাহাড়ের রাস্তাটা আরো নীরব হয়ে গেছে। টানা এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে সব কিছু যেন স্থবির। প্রকৃতি নিজের মত করে ব্যস্ত তখন।

কাটা পাহাড় সড়ক বৃষ্টি থামার পর কেমন চকচকে হয়ে উঠল। বৃষ্টি যেন ধুয়েমুছে দিয়ে গেছে সব। রিকশা নিয়ে খালেদা জিয়া হলের দিকে গেলাম। চারপাশ তখন বৃষ্টির পর নতুন করে জেগে উঠছে। গেস্ট রুমে দুজন তখন খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত।

কাজ শেষে বের হতেই আবার আকাশ মেঘলা। বিকেল চারটা হলেও তখন চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারী সন্ধ্যা।

সমাজ বিজ্ঞান হয়ে আলাওল হলের দিকে যেতে যেতে বৃষ্টি শুরু আবারো। এত দ্রুত রাত নামানো এই বৃষ্টিতে লোকজন শুণ্য হলো রাস্তা। তখন বেরিয়ে দাড়ালাম হলের দক্ষিণে এক চায়ের দোকানে। বৃষ্টি বাড়তে বাড়তে নিজেকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে বারবার । সাথে বজ্রপাতের আলো এসে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে মনে। বাতাসের বেগ ও বাড়তে বাড়তে চারপাশে অস্থির একটা পরিবেশ তৈরি করল। কিছুক্ষণ পর পর দু একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে এগোচ্ছে সামনে।

ঘন্টা দেড়েক পর আবার বৃষ্টি থামার পর আইন অনুষদ হয়ে গেছি সেন্ট্রাল ফিল্ডের দিকে। বৃষ্টি তখন অল্পস্বল্প ঝরছে। যেন এবার রয়েসয়ে পরছে। সেন্ট্রাল ফিল্ডের দক্ষিণ পূর্ব কোণে পাখির কিচিরমিচির। এদিকটা জঙ্গলের মতই ঘন গাছপালা। সব পাখি এসে বাসা বেঁধেছে এখানে।

সেন্ট্রাল ফিল্ডে দাড়াতেই দেখা মিলল স্থানীয় লোকজনের যারা পাহাড় থেকে নানান কিছু নিয়ে ফিরছে। বৃষ্টির ভিতরর সেন্ট্রাল ফিল্ডও নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে দাড়িয়ে। বহুক্ষণ পর পর পাহাড় থেকে দু একজন ফিরছে বৃষ্টির ভেতর।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার সময় কয়েকটা গ্রুপ চোখে পরল যারা বন্ধুবান্ধব সহ বেরিয়ে এই বৃষ্টিতে ইচ্ছে করেই আটকা পরেছে। নিয়মই তাই। যদি এই সময়েই একটু বৃষ্টিতে ভেজা, বাতাসে শব্দে লিচুতলায় না আসে তাহলে আসবেটা কখন?

এবার হলে ফেরার পালা। হলে ঢুকতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই বিকেল থেকেই। হালকা বাতাসেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার যে কথা শুনি সে হিসেবে এত ‍বৃষ্টির পর বিদ্যুৎ সেদিন আর আসাই উচিত না। ভুতুড়ে অন্ধকারের হলে ঢুকেই স্বস্তি অস্বস্তি দুটোই অনুভব হলো। রুমেও তখন জ্বললে মোমবাতি। মোমবাতির অর্ধেক অংশ আগেই জ্বলানো হয়ে গেছে। বিদুৎ না আসার অর্থ এই অন্ধকারেই রাত শেষ করা।

বেরিয়ে এই লাল বিল্ডিং এর বারান্দায় দাড়ালাম। হালকা বাতাসের ঝাপটায় এসে লাগছে গায়ে। কোথাও কেউ তখন নেই। এই নির্জনতার ভেতর ভেতরের সত্ত্বাও খুব সহজ হয়ে উঠে। বাইরে থেকে ব্যাঙ ও পোকা ডাকার শব্দ আসছে। আকাশেও তখন অন্ধকার। এই মায়া জাগোনা সময়ে রুম গুলোতেও সাড়াশব্দ নেই। উপর তলায় হওয়াতে ছাত্রও নেই তেমন।

অনেক পরে আসল বিদ্যুৎ। তাও হলের সবখানে আলো না থাকার কারণে ভুতুড়েই হয়ে থাকল পরিবেশ। রুমের ভিতর বসে অনেকক্ষণ কথা হলো পার্থদার সাথে। রুমের ভিতর ও সেই মায়াময় পরিবেশ।

হলের ডাইনিং এ খেতে আরেকটু দেরীতে গেলেই খাবার শেষ হতো। নানান সংগ্রামের পাশাপাশি খাওয়ার জন্যেও সময়জ্ঞান না থাকলে মিলবে না খাবার। নিজেদের মধ্যে বন্ধন বাড়ানোর জন্যে হল জীবনের বিকল্পও নেই। খেতে গিয়ে গল্প জুড়ে দেয়া নয়ত রাতে কারো রুমে এসে সবাই মিলে বলতে বলতে ভোর নিয়ে আসা। এত জেলার এত মতের এত পথের মানুষের এক হয়ে যাওয়ার যে হল জীবন তার ভেতরের সৌন্দর্য বোধের গভীরতাকে বাড়ানোরই কথা।

অনেক রাত অবধি এ পাশ ও পাশ করে ঘুম এলো না। বারবার বাইরে গিয়ে দেখলাম দুরে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হলের সামেনের অংশ। যেখানে মধ্যেরাতে কেউ জেগে থাকলেও পারত কারো সাথে কথা বলতে বলতে।

ভোরে ছয়টার দিকে ঘুম ভাঙতেই বেরিয়ে দেখি সূর্য তখন পূর্ব হতে উঠে আসছে আরো উপরে। নতুন রুপে চারপাশ। ট্রেন ধরার তাড়া থাকাতে বেরিয়ে আসি। হলের সামনের রাস্তা, খেলার মাঠ চারপাশ এতই সবুজে ঘেরা গত রাতের বৃষ্টির পর পুরোটাই সতেজতায় ভরে গেছে।

হেটে জিরো পয়েন্ট আসার পর ভীড়ও পেলাম না। না শহরে ফেরার তাড়া নেই কারো। এমন পরিবেশের ভেতর থেকে শহরে ফেরার তাড়া থাকবে কেন? ট্রেন আসার আগ অবধি শূণ্য স্টেশন। ট্রেন আসতেই কোথা থেকে যেন লোকজন এসে এতই ভীড় হয়েছে অনেকেই যাচ্ছে দাড়িয়ে।

ট্রেন ছেড়েছে। দু পাশের ক্ষেত ছাড়িয়ে ট্রেন এগোচ্ছে সামনের দিকে। তখন ভাবছি, এই পাহাড়ের আশ্রয়ে থেকে হলের মায়ময় পরিবেশে এসে কিভাবে মানুষ রক্তপাত করতে পারে? কিভাবে ঘৃণা করতে পারে কাউকে!


Post a Comment

0 Comments