হাজারিখিলের গল্প যত

হাজারিখিল যাওয়ার পরিকল্পনা পার্থদার। যে দিন যাওয়ার কথা তার আগের দিনের বৃষ্টিতে শঙ্কা জাগল যাওয়া হচ্ছে তো? শহর থেকে শাটল ধরে ক্যাম্পাস যাওয়ার সময় রোদ তার বিজয় পতাকা উড়িয়েছে। কিন্তু বিপত্তিটা বাধল ক্যাম্পাসে যেতেই। সবাই এক জায়গায় একত্র হতেই কোথা থেকে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল শান্ত ক্যাম্পাস। কিন্তু যেতেই যখন হবে বৃষ্টি কি আর ঠেকাতে পারে?

বৃষ্টির ভেতরই জিরো পয়েন্টে যাওয়া। তারপর একটা বাস পেলাম বিবিরহাটের। এ দিকটায় আমার আগে কখনো যাওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় অবধিই আসা হয়েছে। তবে আমার বাড়ি সীতাকুন্ডের পাহাড়ের বিপরীত পাশের জনজীবনের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল। যে দিকটায় যাচ্ছে বাস সেই ফটিকছড়িতে আমার আদি পুরুষের বাস ছিল।

বৃষ্টির তীব্রতা এত বেড়েছে জানালা খোলা রাখা কঠিন। মোটামুটি এক ঘন্টা পর বাস নামিয়ে দিল ফটিকছড়ি পৌরসভায়। রোজার দিন বলেই খুব ফাঁকা চারদিক। পৌরসভার এই জায়গাটার নাম বিবিরহাট। যেখান থেকে শহরের বাস ছেড়ে যায়। আমরা একটু এদিক ওদিক করে সিএনজি ধরে চললাম হাজারিখিলের দিকে। মিনিট ত্রিশ পরেই বিবিরহাট-খাগড়াছড়ি প্রধান সড়ক থেকে গাড়ি চলতে শুরু করল ভুজপুরের দিকে। রাঙ্গাপানি চা বাগান ছাড়িয়ে চললাম আরো পশ্চিশে। এই ভুজপুরকে অবশ্যই আগেই চেনা। চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা ফটিকছড়ির নাম না শুনলেও নৃশংসতার কারণে ভুজপুরের নাম অনেকেরই জানা।

দু চার দশটা গ্রামের মতনই এদিকটা। কাছাকাছি যেতেই চোখে পরল চা বাগান। রাস্তার দু ধারে বহুদূর অবধি চা বাগান। পাশেই কিছু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বাস। ওরা পুরোদমে কাজ করছে। মোট ১৭ টি চা বাগান আছে এখানে। আর রাবার বাগান আছে তিনটি। এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বিশাল আয়তনের দাঁতমারা রাবার বাগান ও ফটিকছড়িতে।

বৃষ্টি তখন আর নেই। চারদিক স্নিগ্ধ শান্ত হয়ে গেছে। আমরা হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মূল ফটকে পৌছার পর আর গাড়ি নিতে পারলাম না। সেখানে রেজিস্ট্রি করে ঢুুকে পরলাম মূল ফটকের ভেতর। ওখানে লেখা বিলবোর্ড অনুসারে এটা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ২০১০ সালে। আর এটার অবস্থান চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলে। বিলবোর্ডের হিসেবে এখানের প্রধান বৃক্ষ গর্জন, চাপালিশ, সেগুন, কড়ই, মেহগনি ও চুন্দুল। যদিও ভেতরে গিয়ে অনেক কিছু দেখলেও নির্দিষ্ট করে কিছুই দেখা হয়নি।

কিছুদুর চা বাগান পেরিয়ে হাটার পর একটা দোকান। জিনিসপত্র রেখে অল্প হাটতেই ঝিরিপথের শুরু।

এই পথটা অনেক চওড়া ফলে হাটতে তেমন অসুবিধে হচ্ছিল না। দু পাশে ঘন জঙ্গল আর উচু পাহাড়ের কারণে অনেক জায়গাতেই মোটামুটি অন্ধকার তার উপর বৃষ্টির পর মেঘলা পরিবেশ তখনো রয়ে গেছে। ভেতরের দিকে অনেক জায়গাতে পাথুরে পথ সংকুচিত হয়ে গেছে আবার সামনে এতটাই এবড়ো থেবড়ো পাথর যাওয়া বেশ কঠিন। একে অন্যকে ধরাধরি করে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তার উপর ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া বাঁঁশের কঞ্চিতে পা কেটে যাওয়ার ভয়। সব মিলে একটা সতর্কবস্থার মধ্যে না থাকলে এদিক ওদিক হলে বিপদ। বৃষ্টির কারণে বনের ভেতর যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয় তা যারা বনে কাঠ সংগ্রহে যায় তারাই জানে। আমাদের গাইড যাত্রার শুরুতে দা নিয়েছিলেন তখন কারণ বুঝিনি। পথের মধ্যে হেলে পরা কত কত গাছ, বাঁশ যাওয়ার পথকে কঠিন করে তুলেছে। সেগুলা সরাতেই প্রয়োজন দা এর।

আমরা আগে পিছে করে ১২ জন সামনে এগোচ্ছি কিন্তু ঠিক কি দেখতে যাচ্ছি তাই জানি না। হাজারিখিলের নামের পাশে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য আছে জেনে গুগল করে দেখলাম এখানে ১২৩ প্রজাতির পাখি আছে বলা হয়েছে। শীতকালে আসে পরিযায়ী পাখির দল। আর বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে বানর, হনুমান, মায়া হরিণ, বুনো ছাগল, চিতা বিড়াল ও মেছো বাঘ। আমি অনেকটা পথ হেটে গিয়ে বুঝতে পারলাম আসলে এই থাকা আর পর্যটকের জন্যে থাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক। সুন্দরবনে আমরা কেউ বাঘ দেখতে যাইনা কিন্তু বাঘ আছে জানি। জানি দেখা অত সহজ কর্ম নয় তেমনই এখানেও সব কিছু আছে কিন্তু এটা সীতাকুন্ড ও মীরসরাইয়ের পাহাড় গুলোর মতই। যেখানে উঁঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানিতে ঝিরিপথ সৃষ্টি হয়ে চলে গেছে খালে।

এগুলো দেখার দুরাশা বাদ দিয়ে আমরা এগোতে এগোতে চলে গেলাম অনেক ভেতরে। গাইড জানালো ওখান থেকেই সীতাকুন্ডের বারৈয়াঢালা হেটে মোটামুটি ঘণ্টাখানেক পর। আরো এগোলে মীরসরাই শুরু।

আমরা ঘন্টা দুয়েক মত হেটে শেষতক গিয়ে আনন্দ পেলাম দু কারণে। পাহাড়ের একটা অংশ পেরোলেই মিলবে ঝর্ণার দেখা। কিন্তু সেই অংশ পেরোতে ছয় ফুটের বেশি পানি আছে। আর যেটাকে বলা হচ্ছে ঝর্ণা সেখানেও সাত ফুট মতো পানি। দুটো অংশ পেরোতেই দুনিয়ার যত রোমাঞ্চ এসে হাজির। সেই বাধা পেরিয়ে অবশেষে কথিত ঝর্ণাতে যাওয়ার পর আনন্দ হলো। যাক তবে লোকে যাকে ঝর্ণা ভাবে সেখানে আসা তো গেল নাকি!

যেতে/আসতে স্বানীয় লোকজন চোখে পরেনি। গাইড জানালো স্থানীয় মানুষ এদিকটায় আসে না। যা আসে সীতাকুন্ড থেকে বাঁশ কাটতে। তাই পুরো পথটাই একমাত্র আমরা ছাড়া কেউ নেই। দ্বিতীয় কারণ বৃষ্টিতো আছেই।

ফেরার পথটা হয়ে উঠল খুব সংক্ষিপ্ত। আবার চা বাগানের শুরুতে যাওয়ার পর পেলাম পুকুর। অনেকটা সময় পুকুরে সাঁতরে আমরা গেলাম পেছনের দিকে যেখানে রাতে থাকার ব্যবস্থা আছে।

পাশাপাশি কয়েকটা গাছের্ উপর রশি বেঁধে কাঠ, গাছ, টায়ার কে নানাভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। অন্তত ১৫ ফুট উঁচুতে থাকা এই চার/পাঁচটি ধাপ হেটে পেরোতে হবে। পুরো দিনের মধ্যে এই ব্যাপারটাই সবচেয়ে ভিন্নধর্মী।

পরে ফেরার পথে আমরা বিবিরাহট হয়ে বাসের ছাদে উঠলাম। চলন্ত বাসেই ইফতার। সন্ধ্যা নেমেছে তখন। চার পাশে সবুজের বিল ধীরে ধীরে চোখের সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশে চাঁদ তখন আমাদের সাথ চলছে। বাসের আঁকাবাঁকা চলায় আমরাও দুলছিলাম। ছেলে মেয়ে সব গান ধরছে সুরে বেসুরে। জীবন মনে হচ্ছিল এভাবেই যদি লম্বা সফরের হতো। কোন জাগতিক চাপ না থেকে শুধু ছুটে চলা। এই গতিদানব বাসের সাথে। বাসের ছাদে অন্য কোথাও অন্য কোনখানে। সঙ্গে যারাই থাকুক আনন্দ থাকবে জরুর।

এবার আসা যাক ইতিহাসে। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের ক্ষমতায় ছিলেন দিল্লীর বাদশা আওরঙ্গজেব। সে সময় বাংলা শাসন করতেন সুবেদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমেদ আলী খাঁ। তখন চট্টগ্রাম ছিল আরাকানি রাজার দখলে। আরাকানি রাজাকে হটিয়ে চট্টগ্রাম দখল করে নেন উমেদ আলী খাঁ। তারপর নাম বদলে রাখা হলো ইসলামাবাদ। এই বিশাল অঞ্চল শাসন করতে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পুরো এলাকাকে ৭টি চাকলায় ভাগ করে এক একটি পরগণার এক একটি নাম দেয়া হয়। পরবর্তীতে ঈসা খাঁর ইচ্ছাতেই বাইশপুর সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ‘ইছাপুর পরগণা’ গঠন হয়। তার নামানুসারেই সাবেক ইছাপুর পরগণাই পরবর্তীতে বর্ধিত আকারে হয় বর্তমানের ফটিকছড়ি উপজেলা।

বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে ফটিকছড়িকে বলা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবেশদ্বার। ৭১ এর উত্তাল মার্চে এম আর সিদ্দিকী, মেজর জিয়াউর রহমান, জোনাল কমান্ডার মির্জা আবু মনসুর এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা রামগড়ে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প স্থাপন করেন। তারা ট্রেনিং নেযার জন্যে ভারতে আসা যাওয়া করতেন ফটিকছড়িয় হয়ে।

উপজেলার পশ্চিমাংশে ফটিকছড়ি খাল নামক একটি স্বচ্ছ ঝর্ণা আছে। খালটি উৎপন্ন হয়েছে সীতাকুণ্ড পাহাড়ী রেঞ্জ থেকে। তারপর যোগিনী ঘাটায় এসে মিলিত হয়েছে হালদা নদীর সাথে। একসময় ফটিকছড়ি উপজেলার অবস্থান ছিল ভূজপুরের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত এই ফটিকছড়ি খালের তীরে। ফটিকছড়ি খালের নাম অনুসারেই পুরো থা হতেই এই থানার নামকরণ হয়।

এই উপজেলার পশ্চিমে মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড ; দক্ষিণে হাটহাজারী; পূর্বে রাউজান , রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী ও খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি , মানিকছড়ি ও রামগড় এবং উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ অবস্থিত।

ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পাহাড়ী রেঞ্জ শুরু হয়েছে সেটি সীতাকুন্ডের পশ্চিম অংশকে ছুঁয়ে চলে গেছে চট্টগাম শহরে। এই পাহাড়ই বর্ডর তুলে দিয়েছে ফটিকছড়ি ও সীতাকুন্ডের মধ্যে। ওদিকে ফটিকছড়ির পূর্ব প্রান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়।

ফটিকছড়ির প্রধান নদী হালদা। সীতাকুণ্ড পাহাড়ী রেঞ্জ হতে উৎপন্ন হয়েছে গজারিয়া, ফটিকছড়ি খাল, হারুয়ালছড়ি খাল। পূর্ব দিকের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে উৎপন্ন মানিকছড়ি, ধুরুং খাল এবং সর্তা খাল।

একসময় নৌকা যোগে চট্টগ্রাম শহর হতে মালামাল আনা নেয়ার জন্য হালদা নদী নৌ-পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। চাক্তাই থেকে মাল বোঝাই করে নৌকা আসতো নাজিরহাট, বিবিরহাট, কাজিরহাট এবং নারায়ণহাট পর্যন্ত। হালদার নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ কমে এসেছে।

এখানে দেখার মত আরো আছে মাইজভাণ্ডার শরীফ, নানুপুর; ভূজপুর জমিদার বাড়ি এবং ফাঁসির ঘর, পূর্ব ভূজপুর;মং রাজার দীঘি, পশ্চিম ভূজপুর; আহসান উল্লাহ খাঁ গোমস্তার মসজিদ, বখতপুর (আনুমানিক ৪০০ বছর পুরনো); হারুয়ালছড়ি ফকিরপাড়া গায়েবী মসজিদ ; হালদা রাবার ড্যাম, কাজিরহাট; হালদা ভ্যালি চা বাগান, নারায়ণহাট; উদালিয়া চা বাগান, সুয়াবিল।

ফটিকছড়িতে জন্মগ্রহণ করা বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন জমিদারকবি কাজি হাসমত আলী, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ এনামুল হক, কৃত্রিম কিডনীর আবিষ্কারক শুভ রায়, চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা সহ আরো অনেকে।



Post a Comment

0 Comments