কাট্টলী সৈকত : সন্ধ্যা যেখানে শহুরে হৈচৈ

শৈশবের সোনাঝরা দিনে বাতাসের শব্দেও আনন্দ ছিল। সমুদ্রের দিক থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের শব্দে ভাবনা সব উড়ে যেত। আজ এত বছর জীবনের জাগতিক ব্যস্ততায় সে বাতাসের শিহরণ মনের গভীরে অক্ষত রয়ে গেছে। মানবিক প্রেমের দৃশ্যমান উপস্থিতি হারায় কিন্তু শৈশবে প্রজাপতির পেছনে দৌড়ানের স্মৃতির আবরণেও কি মরিচা পড়া সম্ভব?

বলছি যদি দশ তলায় উঠার রেসেই কাটবে জীবনের বহু সেকেন্ড তাহলে দশ তলার ছাদে যে রোদ ছড়িয়ে পরছে বিকেলের শেষ ক মিনিটে সে রোদ ছুঁয়ে দেখবটা কখন? অবশ্য কারো পছন্দ অপছন্দ নিয়ে মন্তব্য করতে এ লেখার আয়োজন নয়। তাই নিজের মধ্যেই থাকার একটা চেষ্টা আছেই।

জাগতিকতার ভেতরেও ছুটি বা বিশ্রাম নামের ব্যথানাশক হাজির হয়। তখন আর রবি ঠাকুরের আহ্বানে ঘরের বাহিরে না গিয়ে থাকা যায় না। যে প্রেম দুদিকের সম্মতির তাতে না হয় নিজের চাওয়া বদলে নিলাম। আর যে মায়া যে শিহরণ একপাক্ষিক? সেখানে সুযোগ থাকছে না দ্বিতীয় বার ভাবার। তাই আকাশে মেঘের ঘনঘটা হোক আর বাদলের ধারায় ডুবুক শহর কিংবা থাকুক রোদে পোড়া মাটির ‍উত্তাপ দু পা ছুটবেই।

কাট্টলী সৈকত দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে বলার চেয়ে বলতে হয় শুধু ছুটির দিন বিকালে বেশ জনপ্রিয়। এতে করে সুবিধে ও হয়েছে বেশ। দু চার বার গিয়েও জোয়ারের দেখা না পেয়ে বুঝিনি জোয়ারের সময় সৈকত শুধু শহুরে সৈকত থাকে না। নির্জনতার ভেতর আলো ছায়ার খেলায় শো শো বাতাসে অদ্বুত মায়া তৈরি করে চারপাশে। যে মায়ার পেছনে ছুটেছি শৈশবের স্কুল পালানো দিনে।

সৈকতের উত্তর দিকটায় গাছ আরো বেশি থাকাতে লোকের আণাগোণা কম। পথগুলাও যে অসুবিধার তা না। কিন্তু নিছক হাটতে খুব একটা পা ফেলতে চায় না কেউ। শুধু পোণা ধরছে যারা ওদের কজনের দেখা মিলে সময়ে অসময়ে। আমরা তখন গাছে উঠে পরেছি। জোয়ার ঢুকছে ধীরে ধীরে। যেমন করে গড়িয়ে যায় হাত থেকে ফস্কে যাওয়া জগের পানি। বাতাসের তীব্রতায় তখন চুলের ভাঁজ নিজের মত নেই।

গর্ত থেকে লাল কাঁকড়া মুখ বের করছে তো টুপ করে ঢুকে পরছে আবরা। জোয়ার ততক্ষণে ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। গাছ থেকে নেমে পেছাতে হলো আরো। জোয়ার পিছিয়ে দিচ্ছে বারবার। এভাবে যেতে যেতে সেই বাতাসের বাইরে চলে গেছি। তখন জোয়ার ও তার ছড়িয়ে পরার দূরত্বে সীমারেখা টেনে ফিরতে শুরু করেছে।

পানির ধারে হাটতে হাটতে পায়ের নিচে সাপ পরে গেল। আসলেই চাইছিলাম ও তা। যে অন্ধ সাপ ছোট বেলায় দেখতাম জোয়ারে নামলে সে সাপ জীবন থেকে বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রেমিকার মতই বিলুপ্ত হতে গেছিল।

এরকম উত্থান মুগ্ধ না করে পারে?

জোয়ার ফিরতি পথে যেতে যেতে চারপাশটাও শান্ত হয়ে এলো। আরো উত্তরের খালে কিছু বোট শব্দ করে যাচ্ছে মাছ ধরতে নয় জাল বসাতে।

দক্ষিণে এসে কজন বাচ্চা পেলাম যারা নেমে গেছে গোসল করতে। জোয়ার যতক্ষণ ছিল ওদের লাফানো দেখেই কাটল সময়।

সন্ধ্যা নামার আগে করে করে ভীড় বাড়ল। মেলা জমেছে মতন। এত ভীড়ে আর বাতাসের মায়া থাকে না।

ভীড়ের ভেতর তো শৈশব নেই। আমি নেই।

আচ্ছা, মানুষের পা পড়েনি এমন সৈকতের সন্ধান জানে কেউ?


Post a Comment

0 Comments