ঈদের ছুটিতে কলকাতায় কেন?

চিটাগং থেকে বাসে উঠে পরদিন সকাল ৬ টায় আমি আর লিপি আপা বেনোপোল বর্ডারে। সরকারকে যে টাকাটা রাজস্ব দেয়ার কথা সেটা বাড়ী থেকে আসার আগেই দেয়ার কথা মনে থাকে না। এই মনে না থাকার ফল হলো মারাত্মক। বাসের কর্মচারীরা পাসপোর্ট জমা নিয়ে যে গেল ফিরল দেড় কি দু ঘণ্টা পর। একা গেলে আমি নিজেই করি। কিন্তু কলকাতা অবধি বাসে যাচ্ছি বলে তাদের দিলাম। এতে ক্ষতিটা বাড়ল আরো। আটটার দিকে পাসপোর্ট ফেরত দিল। যেই লাইন পেরিয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে গেছি দেখি ‍সামনে হাজার মানুষ। আবার সেই লাইন ঢুকে পরেছে বাংলাদেশে। আমরা দুজন হাজার তিনেক মানুষের পিছনে লাইনে দাড়ালাম। এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সকাল ৮ টা থেকে দিনের ৪টার পরেও লাইনে দাড়িয়ে থাকার পর ঢোকা হলো ভারতে।

লাইনে দাড়িয়ে সবাই বিরক্তি প্রকাশ করছে এত মানুষ কেন ভারত যাচ্ছে আজকের এই দিনে। তাহলে তাকে আজ এত কষ্ট করতে হতো না। ভাবখানা এমন সে নিজে যাচ্ছে কুয়েতে! যারা প্রথম বার বেনোপোল বর্ডার হয়ে ভারত যাচ্ছে তাদের রাগ সবচেয়ে বেশি। সত্যি সত্যি কয়েকজন ঢাকাও চলে গেল। সেদিন আনুমানিক ১৫ হাজার জন বেনোপোল বর্ডার হয়ে কলকাতা গেছে। কেন এত মানুষ ঈদের একদিন পর ভারতে?

বিশাল লাইনে রোগী সংখ্যা খুবই কম। কিছু রোগী ছিল যারা আবার রোগী বলায় আগে যেতেও দিল। লিপি আপাও সকালে চলে গেল। বাকী যে মানুষগুলো লাইনে তাদের বেশিরভাগ তরুণ। তারা বন্ধুদের সাথে ভারতে বেড়াতে যাচ্ছে। এদের বাদ দিলে বেশিরভাগ পরিবার নিয়ে যাচ্ছে বেড়াতে। তারপর কিছু মানুষ একাই যাচ্ছে বেড়াতে। আর কিছু সংখ্যাক ছিল ব্যবসায়ী। তবে উদ্দেশ্যটা শুধু ব্যবসা নয়। মোদ্দাকথা ঈদের ছুটিতে বেড়াতে হাজার হাজার বাংলাদেশী আট ঘণ্টার ও বেশি সময় লাইনে দাড়িয়ে ভারত যাচ্ছে। এ বর্ডার বাদ দিলে বিমানে ও অন্য স্থল বন্দর গুলোতে ও নিশ্চয় অনেক ভীড় ছিল। ভোগান্তির পর ও পাড়ে গিয়ে স্বস্তির হাসি। কেন এই ভোগান্তির যাত্রার পর ও হাসি আসে? ভারত বিদ্বেষ বাংলাদেশে বাড়ছে ক্রিকেটকে ঘিরে। অনেক বন্ধুর প্রিয় ক্রিকেট দল ভারত ছিল। তারা এখন প্রচন্ড ভারত বিরোধী। এই বিরোধীতা খেলা ছাড়িয়ে রাষ্ট্র বা জাতির মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। ভারতকে নিয়ে হয়ত ব্যাপারটা অনেকে স্বীকার করতে চাইবে না।

পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থন করা বাংলাদেশীরা সহ্য করতে পারে না কেন? ব্যাপারটা খেলা ছাড়িয়ে যায়। ভারত বিরোধিতাও ওরকম। তাহলে সীমান্তে এত হাজার বাংলাদেশী কেন? ভারতে যাওয়া বাংলাদেশীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কেন? যেখানে ক্রিকেট বিদ্বেষ বাড়ার সাথে সাথে মানুষ ভারত যাওয়া কমানোরই কথা। কারণ আমাদের দ্বিমুখী অবস্থান? আমাদের জাতিগত চরিত্র কি এমন? একদিনে বিরোধীতা আবার অন্য দিকে গিয়ে বন্ধুত্ব পাতানো!

হোটেল না পাবার ভয় ছিল। পরে কলিন লেইনে হোটেল পেয়ে গেলাম। পরিচিত হোটেল তাই খুব একটা অসুবিধেও হলো না। আমরা এর আগের বার গেছি ট্রেনে। এবার মাসখানেক আগে কলকাতা-চেন্নাই বিমানের টিকেট করা ছিল। পরদিন সকালে সন্দ্বীপ দাদা দেখা করতে এলেন নিউ মার্কেটে। উনি যাওয়ার পর বের হলাম এয়ারপোর্টের জন্যে। স্পাইসজেটের টিকেট করা ছিল। প্রথমে লাগেজ স্ক্যান করল। তারপর বোর্ডিং পাস নেয়ার সময় ব্যাগের ওজন নিল। তারপর হাতে থাকা ব্যাগ মোবাইন, ওয়ালেট সহ সব স্ক্যান করে আমাদের ও চেক করল । এরপর একটা জায়গাতে অপেক্ষা করতে হলো।

বিমান এলোই দেরী করে। সিঁড়ির মত উচুঁ জায়গা দিয়ে নিয়ে গেল বিমানে। গিয়ে তো সিট নিয়ে খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষদের জন্যে বিশাল খারাপ লাগল। বিমানের সিট নয় যেন দেশে কয়েক বছর আগে নামানো পাবলিক বাসের সিট। আমার ওতে অসুবিধে নেই। বলা ছিল সিট জানালার পাশেই দিতে।

রানওয়েতে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ উঠে পড়ল আকাশে। লিফটে উঠলে ওজন হারালে যে ধরনের ভয় লাগে সেরকম লাগল প্রথমে। এই ভয় আরো বাড়ল বিমানবালাদের কথায়। তারা শুরু থেকেই বলে যাচ্ছে আপনার সিটের পাশে এটা ইমার্জেন্সি জানালা। যখন আমরা বলব এটা খুলতে হবে। কিভাবে খুলতে হবে এটা সবার কাছে গিয়ে বলেও আসছে। তারপর বলছে বিমান যদি পানিতে পড়ে বা নামানো হয় সিটের নিচে থাকা ওটা পরবেন। কিভাবে পরতে হবে সেটাও দেখিয়ে দিল।

শুরুতেই কি এক আতঙ্কের ভেতর নিয়ে গেল। ব্যাপারখানা হলো বাসের টিকেট করতে গেলে আমি কখনো একদিন আগে করিনা। যখন বাসে উঠব তার ২ মিনিট আগেই করি টিকেট। বেশিরভাগ সময় সিট থাকে পেছনের। আমি জানালার পাশে নিয়ে নিই। কিন্তু অনেকজনকে দেখেছি তারা একদম সামনে নেয় না আবার পিছনের সিট হলে যাত্রাই বাতিল সেদিন। পরে বুঝলাম তারা দুর্ঘটনার কথা ভেবে সিট নেয়ার সময় এত চিন্তা করে। বিমানে দেখি উঠার পরেই দুর্ঘটনা হলে কি করতে হবে সেই কথা বলতে লাগল বারবার।

কোথায় আনন্দ লাগার কথা সেখানে গুটিকয়েক বাদে সবার চোখে মুখে আতঙ্ক। বেশিরভাগ ঠোটঁ নাড়ছিল। দোয়াকালাম পড়ার চেষ্টা। উপরে উঠতে উঠতে এক সময় আর নীচে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। নিচে শুধু মেঘ আর মেঘ। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর আর কিছু দেখা যায় না। বিমান যেন কোন খানা খন্দকে পড়ে গেল ওরকম করে আওয়াজ শুরু হলো আর কাঁপতে থাকল। উঠার আগের কদিন বিমান নিয়ে শখানেক ভিডিও দেখেছিলাম। তাই নতুন করে আর ভয় লাগল না। মেঘের সাথে ধাক্কা খেলে এরকম হয়।

দু পাশে কিছুই দেখা যায় না আর। ঘুমিয়ে গেলাম। আর মনেই হচ্ছিল না বিমান চলছে। কি আস্তে আস্তে চলছে। ল্যান্ড করার আগে আবার শুরু করল। সবাই যেন সিল্ট বেল্ট বাঁধে। কেউ উঠতে পারবে না। তখন একবার নিচে নামছে তো আবার উচুঁতে উঠছে। এরকম করতে করতে ল্যান্ড করল। ল্যান্ড করার পর চোখে মুখে কি স্বস্তি। মনে হলো মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে ছিল বেশিরভাগ। নয়ত তারা ভাবেইনি নামতে পারবে। নামার সাথে সাথে চলে এলো বাস। তারপর লাগেজ বুঝে নিয়ে আমরা ভেলোর যাবার ট্রেন ধরতে কাছের স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে চেন্নাই সেন্ট্রাল হয়ে আবার ট্রেন ধরে কাডপাডি। ট্রেনের পুরো বগিতে বাংলাদেশ থেকে আমরা দুজন ছিলাম বাংলাদেশী। হয়ত শুধুমাত্র দুজন মুসলিম ও।

জানি এটা ঝাড়খন্ড নয় হরিয়ানাও নয় তবুও সম্প্রতি ভারতে মুসলিম হওয়ার অপরাধে গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে যে মুসলিমদের গণপিটুনি দেয়া হলো সেই নিউজের কথা মনে পরছিল বারবার। সাথে বিমানে চড়ার চেয়েও বেশি আতংক। ভারতবর্ষ তুমি কবে পুরোপুরি নিরাপদ হবে সব জাতি ধর্মের মানুষের জন্যে?


Post a Comment

0 Comments