পাহাড় সমুদ্রের স্পর্শে

অভিযোগটা বোনের। তাকে কোথাও নিয়ে যাই না। নিয়ে যাব কি করে। যা অবস্থা আমার দেশের। কোথাও ছেলে মেয়ে দুজন বের হলেই ধরে নেয় এরা প্রেমিক প্রেমিকা। ছেলেবুড়ো সব যেমন করে তাকায়। দুনিয়াতে যেন সব ছেলে মেয়ের সম্পর্কই প্রেমিকা প্রেমিকার। আরে তাও যদি হতো অমন হা করে তাকানোর কি আছে? কোনদিন দেখেনি মেয়ে মানুষ নাকি! তাই আমি বোনকে নিয়ে কোথাও বের হতে অস্বস্তি বোধ করি। যাই না একদম।

আরো কজনকে সাথে পেলে লিজার সাথে ঘুরতে যাব ভাবছি কতদিন। সুমু দিদির সাথে পরিচয় হলো এর ভিতর। পুরো পাগলা আছে। ব্যস এবার চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়ো ‍ছুঁতে হবে। এত কম লোকবলে তো হবে না তাই আঁখির সাথে যুক্ত হলো রিয়াদ ও রাজু। সাথে দিদির বান্ধবী জান্নাত।

শহর থেকে অক্সিজেন হয়ে দিদি ও জান্নাতের সাথে আমরা বড়দীঘিপাড়। আর রিয়াদও আঁখি একেখান থেকে সোজা সীতাকুন্ড। রাজুর তখনো অবসর হয়নি কোচিং এর কারণে। আমরা জিপে চড়ে বসলাম লেক পাহাড়ের রাস্তায়।

আলো ছড়িয়েছে সবে পাহাড়ে। পাহাড়ের কোলঘেঁষে গ্রাম গুলো আড়াল হয়েছে বড় বড় ঘাসের পেছনে। দু পাশে পাহাড় রেখে উঁচু নিচু পথে জিপ চলে এলো ভাটিয়ারী। সীতাকুন্ডগামী বাস ধরে একদম বাজারে। এর ভেতরেই চলে এলো শহরের দুজন আর রাজু।

সদরের নামার বাজারের মুখ থেকে সিএনজি ঠিক হলো একদম পাহাড়ে উঠার পথ পর্যন্ত। সকাল নয়টা মতন হয়েছে। অনেক পর্যটক নামছে পাহাড় থেকে। আর আমাদের সামনে পেছনে এত লোক ছিল বোঝার উপায় নেই কয়টা দল এসছে। আমার তখন রাজ্যের রাগ চেপে বসেছে। আরে পাহাড় দেখতে এসছি কোন সিনেমা দেখতে তো নয়। কেন এত লোক হবে? লোক হয়েছে ভাল কথা কেন এত টাকাতে লাঠি কিনে একেবারে পানি, স্যালাইন সহ ব্যাগ নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে? পাহাড় কি অত কঠিন নাকি?

কিছু পথ যেতেই জনদাবির মুখে কিছু লাঠি কেনা। পথ পিচ্ছিল ছিল তাই কাজে যে লাগেনি তাও না। রাস্তার হাল খুব একটা ভাল নেই। ইট উঠে গেছে তো কোথাও দেবে গেছে। সব মিলিয়ে বিপদজনক অবস্থা। এরচেয়ে বড় বিপদ পাহাড়ে থাকা দোকানগুলো। পানি থেকে শুরু করে চিপস সব জিনিসেই দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নিচ্ছে। তবে এই দেশে এ আর নতুন কি। এক অমানবিক বাংলাদেশের প্রতি বিরক্ত হয়ে আমরা দু একটা পাহাড় ছাড়িয়ে দেখতে পেলাম চন্দ্রনাথকে। রোদ উত্তাপ ছড়িয়েছে ভালভাবেই।

আমি ভাবছিলাম বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যয়ের কথা। উনি আমাদের বাড়বকুন্ড এসে বিরক্ত হয়েছিলেন লোকজন ছিল তাই। উনি এই পাহাড়ে এমন সময় আসলেও দ্বিগুণ বিরক্ত হতেন আমি নিশ্চিত।

পাহাড় দেখতে এসে পথ ভুললে খুব একটা অসুবিধে হবার কথা নয়। কিন্তু পথ ভুলে যাওয়াই এখানে কাল হলো অনেকের। প্রথম একটা ঝর্ণায় পাওয়ার পর সবার উচ্ছাসের আর শেষ নেই। পানিতে শরীর ভিজিয়ে নানান ঢঙে ছবি তোলার পর বাঁধে মূল বিপত্তি। কেউ ভুল করে ডান পাশের পথ দিয়ে উঠলেই তার দম যায় যায় অবস্থা। দুটো খাড়া পখ বেয়ে উপরে উঠা খুব কঠিন তার উপর রাস্তা এমন ভাবে করা দু পাশে পাহাড়ের নিচু খাদ ছাড়া কিছু নেই। এই পথে কোন বাগান ও নেই।

আমরা বাঁয়ের পথ বেয়ে উপরে উঠে গেছি। চারপাশটা অতটা বন্য না। বসার জায়গা আছে। বেশিরভাগ জায়গাতে সিঁড়ি ভেঙ্গে গেছে হাটতে হলো মাটিতে। ঢালু এই পাহাড়গুলোতে জিরিয়ে নেয়ার জন্যে যথেষ্ট জায়গা। বেশিরভাগ পাহাড়ের সংযোগ সিড়িতে বিশাল সমতল জায়গা। যেখানে বসে সীতাকুন্ডে সমতূল ভূমি থেকে শুরু করের দূরের সমুদ্র দেখা যায়। আবছা কুয়াশায় এক অপরুপ সীতাকুন্ড ধরা দেয়। বাতাস না থাকাতে বেশিক্ষণ বসার সুযোগ হলো না। অল্প উঠতেই আমলকি গাছ পাওয়া গেল।

বাজারের আমলিকর পর প্রথম আমলিক গাছ থেকে আমলকি খাওয়ার শখ সবারই। হোক না সেটা ছোট! বাকী পথ উঠতেই আবার দ্বিতীয় বার ঘামের গোসল হলো। এর মধ্যেই অনেক বয়স্ক মহিলা একাই লাঠি ছাড়াই উঠে পরেছে।

প্রথম মন্দিরটার কাছে গিয়ে বসা হলো বেশ কিছুক্ষণ। মানুষের ভীড়ে পাহাড়ের মায়াময় স্নিগ্ধ পরিবেশটা উধাও সাথে বাতাসও নেই। বাকী পথটা ছিল পেয়ারা বাগানের পাশ দিয়ে। রাজু গাছে উঠে বেশকটা পেয়ারা নিল। ঘাসের জঙ্গল ছাড়িয়ে চন্দ্রনাথে উঠে গেল সবাই।

মন্দিরের বারান্দা তখন প্রার্থনা বদলে বিশ্রামের প্রার্থনায় ভরপুর। আমিও শুয়ে পরেছি। পশ্চিমে বিশাল সমুদ্র হাতছানি দিচ্ছে। পূর্ব ও উত্তর দক্ষিণে পাহাড় আর পাহাড়।

মেঘ ধরার কথা বলেছিল আমার বন্ধু সাইফুল। জানিনা মেঘ ধরার কথা সত্যি কিনা। কিন্তু মেঘ কিংবা কুয়াশা মাখা যে পাহাড় চোখের সামনে সেটা দেখে পাহাড়ে এসে মেঘ ছুঁয়ে দেয়ার গল্প কেউ করলে আমি তাতে খুব একটা আপত্তি ও করতে পারি না।

নামার পথে খুব একটা ভীড় ছিল না। দ্রুতগতিতে নামার প্রতিযোগীতাও ছিল না। সেই প্রথম ঝর্ণার পানিতে আবার শরীর ভেজানো। পাহাড় থেকে নেমে নামার বাজার থেকে সিএনজি করে গেছি বাকখালী।

শিবপুর থেকে ভাটেরখীল হয়ে গেলেই বাকখালী গ্রাম। এদিকে ঘাট আছে। আছে জেলেদের ব্যস্ততা। এই বিচটার কথা শোনা যায়নি কোথাও। কাদাপথেই হাটতে হলো। আগের রাতের বৃষ্টিতে বেড়িবাঁধের পরের পুরো এলাকা কাদা জল মাখা।

সীতাকুন্ডের অপরাপর জনপ্রিয় বিচের সাথে এই বাকখালীর মূল ফারাক বেরিবাঁধ থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার হাটা রাস্তা পার হলেই দেখা মিলবে সমুদ্রের। মাঝখানে ফাঁকা মাঠ ছাড়িয়ে গেলে কেওড়া গাছের বাগান তারপর দু একটা ছোট খাল পেরোতে হবে শ্বাসমূল পেরিয়ে।

তারপর আবাল মাঠ ছাড়িয়ে গেলেই আরো এক কিলোমিটার পর সমুদ্র আর দু পাশে কেওড়া গাছের জঙ্গল। দু চারটা জেলে নৌকা মাছ ধরে ফেরার সময় ইঞ্জিন এর শব্দে ব্যস্ত করে তুলে চারপাশ। আবার চলে গেছেই ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া কোথাও কিছু নেই।

বাডা জাল বসিয়েছে জেলেরা। দু একজন মাছ নিয়ে ফিরছেও। জালের ফাঁক গলে আমরা ঢেউয়ের কাছে গেছি। আমার বোন ও। ও ছবি তুলতে শুরু করল ঢেউ দেখে। আমি ভাবছিলাম এই একটা ঢেউ ছুঁতে তার কতটা দিন অপেক্ষা করতে হলো!

মিনিক বিশেক পর গ্রামের চার পাঁঁচ জন ছেলে মেয়ে এসে নেমে পড়ল পানিতে। জোয়ার তখন টান দিয়েছে। আমরা সামনে এগোতে গিয়ে বারবার যেখানে নিশ্চিত হতে চাইছিলাম সামনে গর্ত আছে কিনা ওরা সেখানে গিয়ে নামল গলা সমান পানির ভেতর। আবার উঠেও গেল।

সম্প্রতি সীতাকুন্ডের বাঁশবাড়িয়াতে মারা গেছন অনেকজনই। তখন একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি সবাই বাইরের জেলার। বলতে হয় চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরের। এই বাচ্চা ছেলেগুলোর যে দুরন্তপনা ও সাহস সেটা সমুদ্রের সাথে বেড়ে উঠার কারণেই। এ কারণেই এরা যে কোন সময় নেমে আবার উঠেও যায়। কখনো স্থানীয় ছেলে মারা যাওয়ার খবরও কানে আসেনি।

বিকেল হওয়ার ভয়ে নয় বাসা নামক কারাগারে মেয়েদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে তাই ফেরার পথ ধরা। সীতাকুন্ড সদরে এসে ফেনী থেকে আসা কোন বাস পেলাম না। কেউ দাড়ালই না। যা পেলাম ছোট বাস যারা সিন্ডিকেট করে রেখেছে উঠানামা ষাট টাকা ছাড়া যাবেই না। এই অমানবিক বাংলাদেশে আমি এটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছি। তাও অনুুরোধ করে ভাটিয়ারী অবধি ৫০ টাকাতে রাজি করানো হলো। ভাটিয়ারী যাওয়ার আগেই এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে পথঘাট।

ভাটিয়ারী নামার আগমুহূর্তেই আবার বৃষ্টি। টাকা দিতে গেছি ওরা ৬০ টাকা করেই রেখে গাড়ি চালাতে শুরু করল। বড়দীঘিপাড় অবধি যেতে যেতে পুরো শরীর ভিজে শেষ। একটা জিপ পেয়ে গেলাম। ওটা খুব ধীরগতিতে গিয়ে থামল বড়দীঘিপাড়। এবার এখান থেকে যাওয়ার গাড়ি নেই।

ওই তিনজনকে পাঠিয়ে পরে আমি এলাম বোনকে নিয়ে বাসায়। লিজা এসেই ঘুম। বাবা জানতে চাইলো গেছি কোথায়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের কথা শুনে বাবা বললেন,

আমার মেয়ে পাহাড়ে গেছে তাই না ঘুমিয়ে গেছে!

আমার বাবাও এক সময় পাহাড়ে গেছে। বাঁঁশের বোঝা নিয়ে এসছে। সেই বাঁশ বাজারে বিক্রি করে ঘর সংসার চালিয়েছে। আমি বাবাকে বলার ছিল, তোমার সাথে একবার দুজনেই পাহাড়ে যাব। আবার কোন এক সময়।


Post a Comment

0 Comments