আরাকান রোডের পথ ধরে কর্ণফুলী

চট্টগ্রাম শহরকে যেভাবে দেখি তাতে মনে হয় না এ শহর খুব বড়। তার উপর চেনাজানা জায়গাতে দূরত্ব যতই হোক তা অত বেশি মনে হয় না। জিইসি থেকে যে রাস্তাটা গেছে উত্তরে সেটাকে মূল শহর মনে হতো না কখনোই। নিউমার্কেট, আগ্রাবাদ ও এর চারপাশের এলাকা গুলোই শহরের ছাপ ধরে রেখেছে মনে হয়। যে ছাপ পাওয়া যায় না ষোলশহর পেরোনোর পর। বহদ্দারহাট মানেই শহর থেকেই দূরে কোথাও। এতসব ভাবতে ভাবতে চলে এসছি কালুরঘাট সেতুতে।

দুপুর ১২টা তখন। শুক্রবার হওয়াতে রাস্তাও অনেকটা ফাঁকা। সেতুর আগেই যে তার বাম পাশে চলে গেছে রেল লাইন। তার নীচে যে ফাঁকা জায়গা সেখানে বালু রাখা। এমনিতেই রোদের জন্যে তাকানো কঠিন সেখানে ধূলোবালি ওড়ার কারণে চলে গেলাম রেললাইন ধরে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে সংযোগ ধরে রাখা এই সেতুটি এতটাই ছোট আয়তনে দু’দিক থেকে গাড়ি চলাচল করতে পারে না। ফলে সারাদিন এপারে নয়তো ওপারে গাড়ির লাইন থাকেই। আর ট্রেন চললে দু‘দিকের গাড়ি চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়। মানুষের চলাচলে তো আর বাধা নেই! কোথায় যাব না জেনে গেলে যে কোন জায়গাতেই যাওয়ার সুবিধা। সেতু পার হতেই বাম পাশের পাকা রাস্তা দেখে নেমে পড়লাম। দোকনপাট যা আছে বন্ধ। আমরা হাটতে থাকি সামনের দিকে। জায়গাটার নাম কদুরখিল। দূরত্ব বোঝাতে যে পিলারগুলো থাকে ওরকম একটা পিলারে লেখা আছে ১৪ কিলোমিটার। জায়গাটার নাম অস্পষ্ট। আমরা হাঁটছি আর কিছু সময় পর পর সিএনজি আসা যাওয়া করছে।
একটু ভেতরের দিকে যাওয়ার পর অনেকটা পথ দু’পাশে ঘন জঙ্গল। ঠিক জঙ্গল না রাস্তার দু’পাশের গাছের সারি ও ঝোপঝাড়। রাস্তা তখন আরো ফাঁকা হয়ে গেছে। আরেকটু ভেতরে যাওয়ার পর রাস্তার পাশে জঙ্গল কমতে থাকে।
তারপর স্পষ্ট হয়ে উঠে কর্ণফুলি। রাস্তার পাশ ঘেঁষে গেছে কর্ণফুলি। তবে মূল নদীটা দূরে। চরের মত হয়ে গেছে পানি এসে। আর ডান পাশে বাড়িঘর আর তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। বাঁশঝাড় সহ আরো বড় বড় গাছের জঙ্গল ওদিকটা। আর নীচু জায়গা গুলো ডুবে আছে পানিতে। বোঝাই যাচ্ছে এগুলো কর্ণফুলির সাথে মিশে গেছে খাল হয়ে। আলো ছায়ার খেলা চলছে জঙ্গলের ভেতর। রোদ পরছে পাতার ফাঁক গলে। সেই রোদ মাটিতে এসে পরেছে আরেকটা ঝরে যাওয়া পাতার উপর। পাতার অর্ধেক অংশ আবার পানিতে। সেখানে ও রোদ ঝলমল করছে। পুরো পরিবেশটা প্রকৃতির নিজের। কোথাও কেউ নেই। ভেতরের দিকে কিছু বাড়ি ঘর দেখা গেল। এই জঙ্গলের ভেতর কোথাও ছোট সাঁকো আবার কোথাও সোজা রাস্তা তৈরি করেছে। কিন্তু কোনটাই শহুরে ধাঁচের নয়।
এদিকটায় এখনো ইট-পাথরের বসত গড়ে না উঠায় এই আলো ছায়ার খেলা দেখার সুযোগ হলো পুরোটা পথ। রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া ছোট ছোট খাল। কোথাও নৌকা বাঁধা। তারপর মাছ ধরার জাল কিছু দূরত্ব পর পর। এগোতে এগোতে ডান পাশে তাকিয়ে দেখি কর্ণফুলি আরো মেলে ধরেছে নিজেকে। চর নয় কর্ণফুলির মূল অংশই এসে গেছে রাস্তার পাশে।
ঢেউ তো নেই একটু পর পর পানির স্রোত এসে ছোট শব্দ করে আবার ফিরে যাচ্ছে। নদীতেও দুয়েকটা নৌকা ছাড়া কোন ব্যস্ততা নেই।


কদুরখীলে এ জায়গটায় একটু কাজ করা হয়েছে। বসার জন্যে সিমেন্টের তৈরি লম্বা আসন তেরি করা হয়েছে কোথাও আবার কোথাও ব্যক্তি উদ্যেগে চেয়ার পেতে রাখা। খাবারের দোকানও আছে কয়েকটা। বিকেল হতেই এ অংশে ব্যস্ততার শুরু হয়। সেই বিকেলে এত মানুষের ভীড়ে কি কর্ণফুলির পানি এসে ধাক্কা লেগে ফিরে যাওয়ার শব্দ শুনতে পায় কেউ?

পথ কতক্ষণে শেষ হবে তখনো জানি না। ওদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। সিএনজি থামিয়ে জেনে নিলাম সামনে যাওয়া যাবে কোথায়। যখনি বললেন আরো অনেকটা পথ গেলে ঘাট আছে যাওয়া যাবে কর্ণফুলির ওই পাড়ে, আমরা উঠে পড়লাম।

কর্ণফুলি আস্তে আস্তে চোখের আড়ালে চলে গেল। একটা ব্যস্ত গ্রামের ভেতর দিয়ে চলছে গাড়ি। ধানক্ষেত দু’পাশেই। গ্রামের নাম চরণদ্বীপ।
বিশ মিনিট পর চলে এলাম ঘাটে। ছোট ছোট নৌকায় এপাড়- ওপাড়। ইঞ্জিন ছাড়া একটা নৌকায় পাড় হলাম কর্ণফুলি। ওপাড়েই লম্বুরহাট। রাউজানের একটা এলাকা। লম্বুরহাট থেকে সিএনজি ধরে গশ্চি ধরের টেক। তারপর হাইওয়ে। পূর্ব দিকে চলে গেছে রাঙ্গুনিয়া আর পশ্চিমে হাটহাজারি।
রাউজানে প্রথম যারা বসতি স্থাপন করে তারা ছিল বৌদ্ধ। রাউজানের বিনাজুরীতে প্রায় ৪ শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। তবে এ এলাকায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আরো প্রাচীন। বলা হচ্ছে মোঘল সুবেদার শায়েস্তা খান ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রায় ১০০০ বছরে আগে থেকেই চট্টগ্রাম বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগ বা আরাকানীদের অধিকারে ছিল। আমরা আসার পথেও দেখেছি একটা জায়গার নাম আরাকান রোড।
রাউজানে জন্মগ্রহণ করা বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন মাস্টারদা সূর্য সেন, মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন, চট্টলবিদ নামে পরিচিত ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরী যিনি ’চন্দ্রাবতী’ কাব্যের রচয়িতা কবি কোরেশী মাগণ-এর সপ্তম অধস্তন পুরুষ। কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি কবিতাটির লেখক মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা অম্বিকা চক্রবর্তী, চট্টগ্রামে নারী শিক্ষার অন্যতম অগ্রদূত নূতন চন্দ্র সিংহ, বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া, ব্রিটিশ ভারতীয় ভারততত্ত্ববিদ, পালি ও বৌদ্ধশাস্ত্রে পণ্ডিত বেণীমাধব বড়ুয়া। ঠিক নদীর ও পাড়ের উপজেলায় জন্মেছেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী কল্পনা দত্ত, বিপ্লবী সূর্য সেনের সহকর্মী বিনোদবিহারী চৌধুরী, বাংলা কবিগানের অন্যতম রূপকার রমেশ শীল, লোকগীতি সংগ্রাহক আশুতোষ চৌধুরী, আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষসহ আরো অনেকে।
রাউজানে জন্মগ্রহণ করেছেন মধ্যযুগের কবি দৌলত কাজী। আরাকান রাজসভার কবি ছিলেন তিনি। তার লেখা কবিতার দু’লাইন দিয়েই লেখাটা শেষ করি,
কর্ণফুলি নদী পূর্বে আছে এক পূরী
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।
এই রোসাঙ্গ আজকের আরাকান।

Post a Comment

0 Comments