মগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া

কুতুবদিয়া গেছি বেশ কয়েক মাস হয়ে গেছে। মিশু বলছিলো ছবিতে আমার ভুঁড়ি খুব উজ্জ্বল হয়ে আছে। ভুঁড়ির ছবি ঠেকাতে হোক আর ব্যস্ততায় লেখাটা শেষ করা হয়নি। ফেসবুক স্ক্রলিং বাদ দিয়ে আবার লেখা শুরু করার এ ব্যাপারটা নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ।

মিশু রাতে কল দিয়ে বলল চল কুতুবদিয়া যাই। না করার মত কারণ হাতে ছিল না। ও ভোর বেলার উঠার তাগাদা দিয়ে ঘুমাতে গেল।

সকাল সকাল নতুন ব্রিজ হাজির সবাই। গাড়িই এলো না। সান লাইন নামের একটা ছোট সাইজের বাস হাজির। কুতুবদিয়াকে কোথায় হাতিঘোড়া ব্যাপার মনে করেছি সেখানে এই ছোট বাসে যেতে হবে ভেবে মন ভেঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আগের রাতের ঘুম বাকী তখনো।

ঘুম ভাঙল বাঁশখালী এসে। বাঁশ আছে পরে নেই সেটা থেকে বাঁশখালী নামটা এসছে এরকম তিনটা কিংবদন্তী পেলাম উইকিপিডিয়াতে। সবশেষটা ভাল।



এ কিংবদন্তী অনুসারে, সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়ায় সাঙ্গু নদীর তীরে মরহুম মৌলানা শরফ-উদ-দীন বেহাল (রহ.)-এর মাজার দৃষ্ট হয়। জনশ্রুতি মতে ঐ বেহাল সাহেব মযযুব ছিলেন। আরো শোনা যায় জোর করে তিনি মগ মহিলাদের দুধ পান করতেন এতে মগেরা বিরক্ত হয়ে মস্তক কেটে তাকে হত্যা করলে দেখা যায় বার বার তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। তখন মগেরা তার ছিন্ন মস্তকটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে আসে। অনেক দিন পরে সমুদ্র বক্ষ থেকে জেলেরা ঐ মস্তক উদ্ধার করে এবং আশ্চর্য হয় দেখে যে, মস্তকটি এখনও তাজা। ছিন্ন মস্তকটির দেহের খোঁজ নেয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাশেঁর উপর ডগায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। অপরদিকে মুণ্ডু বিহীন দেহটি বেশ কয়েকদিন তরতাজা থাকায় বাজালিয়া বাসী কিছু মুসলমান ও কিছু মগও খণ্ডিত মস্তকটির খোঁজে সমুদ্র উপকূলে আসে। মস্তকটির খোঁজ পেলে দুই পক্ষই দেহটি (মস্তক ও দেহ) রেখে দিতে চায়। শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হল পরের দিন শিরটি যদি সকাল পর্যন্ত বাঁশের ডগায় থাকে তবে শির সহ দেহটিকে সমুদ্র উপকূলে দাফন করতে হবে আর যদি বাঁশের ডগা থেকে শিরটি পড়ে যায় তবে দেহটি বাজালিয়ায় দাফন করা হবে। পরদিন সকালে যথারীতি দেখা যায়শিরটি মাটিতে পড়ে আছে। উল্লেখ্য উভয় পক্ষের লোক সারারাত পাহারায় ছিল তাদের অলক্ষ্যে কখন যে শিরটি মাটিতে ছিটকে পড়ল তারা বুঝতে পারেনি। সবাই বলতে লাগল বাঁশ তো খালী। পরে দেহটি বাজালিয়ায় দাফন করা হয়। সাতকানিয়ায় বেহাল সাহেবের মাজার অত্যন্ত সম্মানিত। যাত্রীবাহী গাড়ী মাজার অতিক্রমকালে যাত্রি নামিয়ে দেয়। সেই ছিন্ন মস্তক ছিটকে পড়ার পর থেকে অর্থাৎ বাঁশটি খালী হয়ে যায় । এভাবে বাঁশখালী নামের গোড়াপত্তন হয়।



দু পাশে বিল আর বিল। সীতাকুন্ডে অংশে দু পাশে শিল্পকারখানার কারণে কিছুই দেখার সুযোগ নেই। সে তুলনায় বাঁশখালীতে সবুজ দেখা যায় মন খুলে।

এদিকটায় জায়গার নাম গুলো অদ্ভুত। টাইম বাজার, জলদি বাজার, প্রেম বাজার পেরিয়ে পৌছলাম মগনামা ঘাটে। ঘাটের কাছাকাছি আসতেই দেখি বাড়ি গুলো বাড়ি নয় যেন দ্বীপ। ব্যাপক লবণ চাষ করা হয় এদিকটায়।

বৃষ্টি বৃষ্টি একটা ভাব আছে। মগনামা ঘাট অত বড় না। স্পিড বোট আসলে বলে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু এসেও উঠার সুযোগ হলো না। কোন সরকারী কর্মকর্তা এসছে। যেতে হবে মাল বোটে।

উঠে পরলাম। ঘোলাটে সমুদ্রে ওভাবে দেখার কিছুই নেই। রোদ তখন মাথার উপর। ছোট একটা নৌকায় অনেক লোকজন। একটু গভীরে করে জাল পাতা বলে খাল হয়ে ঘুরে গেল বোট।

কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হতেই চারপাশে বেশ হৈ চৈ। আমরা রিকাশায় চাপলাম। যাব নজরুল ভাইয়ের কাছে।



বর্ষা যায় যায় করছে তখন। মাঠ ঘাটে পানি আর পানি। উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত যেতে যেতে সবেচেয়ে বেশি চোশে পড়লো স্কুলগামী মেয়েদের উপস্থিতি।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ দ্বীপে মানুষের পদচারণা বলে ধারণা করা হয়।। হযরত কুতুবুদ্দীন নামে এক কামেল ব্যক্তি আলী আকবর, আলী ফকির, এক হাতিয়া সহ কিছু সঙ্গী নিয়ে মগ পর্তুগীজ বিতাড়িত করে এ দ্বীপে থাকতে শুরু করেন।

অন্যদিকে আরাকান থেকে পলায়নরত মুসলমানরাও এ দ্বীপে আসতে থাকে।

নজরুল ভাই এখানে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। খাওয়া দাওয়া শেষ করে কুতুবদিয়া বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখাতে নিয়ে গেলেন। কুতুবদিয়ার দক্ষিণে আলী আকবরের ডেল এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এটি।

বায়ু বিদ্যুৎ সংলগ্ন এলাকায় সমুদ্র বেশ গভীর মনে হলো। সিমেন্টের ব্লকের পর উত্তাল সমুদ্র।



সেখান থেকে পরিষদের পাশের সৈকত দেখতে গেছি। বর্ষা থাকায় রাস্তা খারাপ হওয়ায় কুতুবদিয়া বাতিঘর দেখা গেল না। সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের নাবিকদের পথ দেখাতে বহুকাল আগে এটি তৈরি করা হয়েছিল। অবশ্য সময়ের সাথে সাথে সেটি সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। জোয়ার না থাকলে ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় জেনে দেখার একটা আগ্রহ ছিল।

বাইক ভাড়া করে ভাইয়া নিয়ে গেলেন কুতুবদিয়ার পূর্ব পাশটা দেখাতে। বাড়ি গুলো সব খোলা মাঠের ভেতর। পাশেই লবণের ঘের। মাইলের পর মাইল লবণের ঘের চলে গেছে। কোথাও কেউ নেই।

যান বাহন হিসেবে চাঁদের গাড়ি আছে। মানুষ ভর্তি চাঁড়ের গাড়ির পেছনেও ঝুলে থাকে বেশ কজন। পেট্রোল পাম্পের কোন ব্যবস্থা নেই। পাইপে করে তেল ভরা হয় গাড়িতে।

ব্যক্তিগত বাইকের সংখ্যা বেশি। ভাড়ায় চালিত বাইকও পাওয়া যায়। জীবনযাত্রার পুরোটাই প্রায় সমুদ্রকেন্দ্রিক। সমুদ্র অর্থনীতি ছাড়া অচল এই কুতুবদিয়া।



বেশ কয়েক জায়গাতে উন্নয়ন কাজ চলছে। ফায়ার সার্ভিস এর বিল্ডিং তোলা হচ্ছে। পাশেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। আলাপ করে জানা গেল, স্থানীয় ছেলেরা প্রাইমারী স্কুল ছাড়ার পরই শহরের দিকে চলে যায়। হয় কক্সবাজার নয়তো চট্টগ্রামে। তাই মেয়েদের সংখ্যা বেশি চোখে পড়ে।

দক্ষিণ দিকে বিশাল এলাকায় শুধুই লবণের ঘের। কোথাও কোন পথঘাট নেই। দু একটা পরিবার থাকলেও তারা সরে গেছে বর্ষার শুরুতে।

বিদেশী সংস্থা উদ্যেগে কিছু পাকা বাড়ি করে দেয়া হয়েছে। সেগুলো কোনভাবে টিকে আছে।

ভেঙ্গে পড়া একটা ঘাটের কাছে গেলাম। লোকজন নেই।

ফিরে এসে বড়ঘোপ সৈকতে গেছি। সৈকতে অনেক গ্রুপে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলছে স্থানীয় লোকজন। দর্শকও যথেষ্ট।

ঢেউ যেখানে থেমে যাচ্ছে সে জায়গাতে বেশ কয়েকটা মাছ ধরার ট্রলার বাঁধা। এরকম উন্মুক্ত সৈকত কক্সবাজারে দেখা যায়।

অন্ধকার নামছে দেখে তাড়া দিলেন নজরুল ভাই। ফেরার সময় হয়ে এলো। সাতটার ভেতর আবার ঘাটে আসতে হবে। নয়তো আর ফেরার বোট পাওয়ো যাবে না।

বোট পেলাম। শখানেক মানুষ তুলে নিল।। অন্ধকার একদম গাঢ় হয়ে গেছে। এ অন্ধকারে কিভাবে চলাচল করে বোট তাই অবাক করে দিল। হুজুর ছিলেন কজন ধরার চেষ্টা করলেন।



ছোট ইঞ্জিন ঢেউ স্রোত ঠেলে উল্টো দিকে চলছে। সে শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকালে চারপাশটা দেখা যায়।

ঘাটে আসতে ঘণ্টাখানেক লাগলো প্রায়। এসে সিএনজি পেলাম শহর অবধি। পথে টাইম বাজার, প্রেম বাজার দেখা হলো।

ফেরার পথে আনোয়ারাও আংশিক দেখা হলো। আমার বান্ধবী তানজিমার আনোয়ারা!

Post a Comment

0 Comments