এগিয়ে থাকার চেষ্টাগুলো

উপমহাদেশে যুদ্ধ যুদ্ধ রব। ভারতীয় এক বায়ু সেনা পাকিস্তানে আটক হওয়ার পর বদলে গেল পরিস্থিতি। রীতিমত শান্তির সুবাতাস বইছে। এর মধ্যেই সদ্য ছেড়ে আসা অফিস থেকে বন্ধুর ফোন। বেতন হয়েছে। অফিস ছেড়ে আসার এক মাস পর তার পূর্ববর্তী মাসের বেতন পেয়ে ক্ষোভ, রাগ সব ধুয়ে মুছে গেল। পকেটের অবস্থাও সুবিধের না। যানবাহনের উপর খুব একটা ভরসাও করতে পারি না। আধ ঘন্টা মত হেটেই গেছি অফিসে।
কদিন হলো অফিস ছেড়ে এসছি। খুব একটা কথাও খুঁজে পেলাম না। সবাই কাজে ভীষণ ব্যস্ত। হওয়ারই কথা। আমার কৃত্রিম তাড়া ফেরার জন্যে। স্টেশনে একটা ট্রেন আসার সময়ও হয়ে উঠেছে। ঝাউতলা স্টেশনে নাজিরহাটের ট্রেন ধরতে গুটিকয়েক মানুষের অপেক্ষা।
দাড়িয়ে থাকতে থাকতে কানে এলো কেউ ভারত সম্পর্কে কিছু একটা বলছে। ছেলেটার বয়স পঁচিশ মতন হবে। বলছে ভারতীয়দের থেকে আমরা অনেক উন্নত। পাশেই ষাটোর্ধ এক বড়ই বিক্রেতা বিক্রি না হওয়া বড়ই নিয়ে ট্রেনের অপেক্ষায়। তার পরিচিত অন্যজন শহরে এসেছেন বেগুন নিয়ে। তার ঝুড়িতে বেগুন নেই। কথার ফাঁকে বেগুনের কথা বললেন। ভাল দাম পেয়েছেন। আলোচনায় তার অনেক উৎসাহ।
অল্প দূরেই বোরকা পরে এক তরুণী দাড়িয়ে। সেও কান খাড়া করে রেখেছে। ওই ছেলেই বলছে, ওখানে কেউ কারো বাড়িতে বেড়াতে যায় না। গেলে থাকতে দেয় না।
বড়ই বিক্রেতা এ কথায় সাঁয় দিলেন। যিনি বেগুন বিক্রি করেছেন তিনি বলা শুরু করলেন। তার ভাষ্য, ভারতের মানুষ খুব কৃপণ। তারা কখনো বড় মাছ কেনে না। একটা বড় মাছ ৫ জনে ভাগ করে কেনে। আমাদের মত নয় তাদের মন।
পাঁচ সাত কেজির একটা মাছ আমি একাই কিনি। মুম্বাই আছে না? ওই যে মানুষ বলে বোম্বাই সেখানের অবস্থা তো আরো খারাপ।
এবার তাকে থামিয়ে ছেলেটা শুরু করলো। ভারতের কথা কি বলব। ওখানে তো অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনো খোলা জায়গাতে পায়খানা করে। কলকাতা থেকে ট্রেনে যাওয়ার সময় কত মানুষকে খোলা জায়গাতে পায়খানা করতে দেখা যায়।
বড়ই বিক্রেতা এবার কথা বললেন। আমরা তো খুব ভাল আছি। এর মধ্যেই ট্রেন আসার শব্দ পাওয়া গেল। আলোচনা সেখানেই শেষ। এই ট্রেন এসেছে মিনিট বিশেক দেরী করে। অবশ্য ট্রেনের এই দেরী হওয়া না হওয়া নিয়ে ঘরে ফেরা এই মানুষদের কোন তাড়া নেই।
ট্রেন থেকে নামার পর টং দোকানে খেতে গেছি। দোকানের তিন চারটা জায়গাতে চেয়ার পাতা ছিল সেগুলো তুলে রাখা হয়েছে। জানতে চাইলাম ঘটনা কি? বলল পুলিশ এসে উঠিয়ে দিয়ে গেছে। আইনের শাসনের এমন প্রয়োগে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।
ফেরার পর বাসা ভাড়া সহ যাবতীয় টাকা দেয়ার পর হাত শূণ্য। এই শূণ্যই জীবনের বড় শূণ্যতা হয়ে দাড়িয়েছে। পরদিন পরীক্ষা থাকায় সকাল সকাল উঠতে হলো।
বন্ধু রবের সাথে বাস ধরেছি। ট্রেন এখন আর খুব ভাল পাই না। অবশ্য চবির এই ট্রেন এখনো তার খ্যাতি ধরে রেখেছে। এই জীর্ণশীর্ণ ট্রেন গর্বের হতে পারলে খ্যাতিও যুগ যুগ টিকে থাকবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
পরীক্ষার হলে গিয়ে ক্ষুদ্ধ হওয়ার মত বোকামো করলাম। পড়িয়েছে কি আর এসছে কি। অবশ্য ভুল ভাঙতে দেরীও করিনি। কারো হাতেই দেশ পছন্দ করার সুযোগ থাকে না। থাকলে সবাই হিসেবে নিকেশ করেই বাছাই করে নিতো। পরীক্ষা পূর্ব সময়ে সেশন জটের সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে সেই ঝড় গেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে। যেহেতু পূর্ব পুরুষদের নির্মিত এই সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়াশীলতা একটি মাত্রা পেয়েছে সেখানে ক্ষুদ্ধ হওয়াও বোকামো। যা হচ্ছে তা প্রাপ্যও বটে। অন্যায্যতা জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা পেলে সেখানে এসব স্বাভাবিক।
পরীক্ষা শেষে অটোরিকশা ধরে বাস স্ট্যান্ডে আসব। পাশে আরো দুজন। এক বয়স্ক ব্যক্তি পাশের জনের সাথে কথা বলছেন। জায়গা কিনবেন। কত দাম পরবে। কোন জায়গাটা নিলে কত বছর পর পর আর কত দাম বাড়বে সেসব আলাপ। পাশের জন বেশ উৎসাহ দিচ্ছেন জায়গাটা কেনার ব্যাপারে। তার খুব উৎসাহ। বোঝা গেল এই বিকিনিকিতে তার অর্থযোগ আছে।
ড্রাইভারের পাশে থাকা লোকটা ড্রাইভারের পূর্বপরিচিত। সে বেশ ক্ষুদ্ধ। ভাইয়ের সাথে তার জায়গা জমির বিরোধ। সেসব নিয়েই অশান্তি লেগে আছে। কদ্দুর যেতেই তিনি নেমে গেলেন।
বাস ধরেছি। পথিমধ্যেই দুই জায়গাতে দেখলাম দুই ব্যক্তি মারামারি করছে। কিল ঘুষি যে যা পারছে দিচ্ছে। তারা সম্ভবত যাত্রী ও ড্রাইভার। লোকজন চারদিকে দাড়িয়ে দেখছে। ছোট একটা ঘুমের পর চলে আসি শহরে।
শহরে আসতে আসতে ফেসবুক মারফত জানতে পারি ইন্দো-পাক পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। আটক ভারতীয় বায়ুসেনা মুক্তি পাচ্ছে।
ফেসবুক ঘুরে অসংখ্যা যুদ্ধবিরোধী বার্তা পেলাম। পাকিস্তানের তরফ থেকেও বুদ্ধিজীবিরা রাস্তায় নেমেছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে। পত্রিকাগুলো অবশ্য যুদ্ধ বাঁধানোর চেষ্টার কমতি করছে না।
বাসায় ফিরলাম রাত করে। স্টেশনে দেখা সেই মুখগুলো থেকে শুরু করে টং দোকানী, জীর্ণশীর্ণ ট্রেনের গর্বিত ছাত্রসমাজ, আমার শিক্ষকদ্বয়, জায়গা কেনার চেষ্টায় থাকা সেই ব্যক্তি, ভাইয়ের সাথে অশান্তিতে থাকা মানুষটা, রাস্তায় কিল ঘুষি দেয়া লোকগুলোর চেহারা মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে পড়ছে না।
তবে এক জীবনে নানাভাবে বিজয়ী হওয়ার সংগ্রাম সবার সেটা ঠিক বুঝতে পারছি।


Post a Comment

0 Comments