চিকিৎসার জন্যে ভারতে যাবেন?

ভেলোর দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রদেশ তামিল নাড়ুর একটি জেলা শহর। বাংলাদেশিদের কাছে ভেলোর তার নান্দনিক গুরুত্বের চেয়ে চিকিৎসা সেবার জন্যে বেশি পরিচিত। শুধু কি বাংলাদেশী? খোদ ভারতের অন্য প্রদেশগুলোর (উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ সহ সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো) কাছে তামিলনাড়ু পরিচত হয়ে উঠেছে ভেলোরের চিকিৎসা সেবার জন্যে। এছাড়াও পড়শী দেশ নেপাল, ভূটান থেকেও চিকিৎসার সেবার জন্যে ছুটে আসছে দক্ষিণ ভারতের এই জেলায়।
স্বাস্থ্য সেবার জন্যে তারা ছুটছেন এই প্রদেশ থেকে ওই প্রদেশে আমরা বঙ্গোপসাগরের এপাড় থেকে ওপাড়ে। ভেলোর শহরেই আছে চিকিৎসার জন্যে প্রসিদ্ধ সিএমসি (ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ) ও শ্রী নারায়ণী হাসপাতাল।
অবশ্য যারা চেন্নাইতে যান তারা চেন্নাই এ্যাপোলো এবং রামচন্দ্র হাসপাতালে দেখান। হাসপাতালের মান ও সেবা দারুণ। চিকিৎসা খরচের কথা যদি বলতে যাই সেবার তুলনায় খরচ কম।
সিএমসি হলো খ্রিস্টান মিশনারী পরিচালিত একটি অলাভজনক হাসপাতাল।
এই হাসপাতালে প্রায় সকল ধরনেরর রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। অবশ্য বাংলাদেশিদের সিএমসি পরিচিত ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যে। এছাড়াও ‍নিউরো সাইন্স, নিউরোলজী, সকল প্রকার সার্জারী, নাক, কান, গলা, ডেন্টাল, মেডিসিন, গাইনি, মেন্টাল, শিশু ডিপার্টমেন্ট, অরথোপেডিক্স, পাইলস, ডারমাটোলজি, সাইকোলজি, হেপাটোলজি, নেফ্রোলজি, প্রেগন্যান্সি ডিপার্টমেন্ট, হার্ট ডিপার্টমেন্ট ছাড়াও প্রায় ১৫০টি ডিপার্টমেন্ট আছে এখানে।
চিকিৎসা কোথায় করাবেন তার আগে কিছু ব্যাপার ভাবতে হবে। যদি আপনার প্রচুর ধৈর্য আর পর্যাপ্ত সময় না থাকে সিএমসিতে না যাওয়াই ভাল। এখানে রোগীর এত চাপ আপনাকে সবকিছুর জন্যে লাইনে দাড়াতে হবে। সেটা লিফট থেকে শুরু করে টাকা দেয়া, ডাক্তার দেখানো, মেডিসন কেনা, টেস্ট করানো সবকিছুতেই। অন্যদিকে আপনার যদি টাকার সমস্যা না থাকে চলে যান চেন্নাই এ্যাপোলোতে বা শ্রি রামচন্দ্র বা নারায়নী হাসপাতালে। চোখের যে কোন চিকিৎসার জন্য চেন্নাই এর শংকর নেত্রালয় ভাল। আর অর্থোপেডিক চিকিৎসা হলে সিএমসি বা অ্যাপোলোতে করাতে পারেন।
তবে আমি সিএমসি থেকে ঘুরে এসছি। তাই সিএমসি কেন যাবেন সেটা নিয়ে ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। দেশে যে ধরনের ডাক্তারি হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে এখানে তেমন আশঙ্কা নেই। আর খরচ আমাদের প্রাইভেট মেডিকেলের চেয়েও কম। বাড়তি ওষুধ দেয়ার যে প্রবণতা বাংলাদেশের ডাক্তারদের আছে সেটাও এখানে নেই।
বাংলাদেশীদের যে অভিযোগ থাকে ডাক্তার ২০ সেকেন্ড কথা বলেই প্রেসক্রিপশন লেখায় মন দেন এখানে সেটা তো করতেই পারবেন না উল্টো বিরক্ত হবেন আগের জনকে এত সময় নিয়ে দেখার কি আছে!
আর হাসপাতাল কতৃপক্ষ ও ডাক্তারদের ভাল ব্যবহারের জন্যে পরেরবার ছোটখাটো সমস্যা হলেও আপনার ভেলোর আসতে ইচ্ছে করবে।
ভাষা নিয়ে দুশ্চিন্তা
একে তো অসুস্থতার চাপ তার উপর বাইরের দেশে তাও বাংলাভাষী না থাকা জনপদে যাওয়ার কথা ভাবলে কপালে চিন্তার ভাঁজ পরবেই। এর আগে পাসপোর্ট ভিসার যুদ্ধে উতরাতে হবে। তবে ভাষা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা থাকেই সবার। যদি মোটামুটি হিন্দী বলতে পারেন কলকাতা ও তামিলনাড়ুতে বেশ চালিয়ে নেয়া যাবে। হোটেল/লজের যে তামিলরা আছে তাদের বেশিরভাগই বাংলা বোঝে। বেশিরভাগ ডাক্তারও বাংলা বোঝে।
সুতরাং কোন হোটেলে গিয়ে খেতে গেলে বা এই রুমটা কোথায় এটুকু বলতে পারার মত হিন্দী জানলেই চলে যেযে পারেন কোন চিন্তা ছাড়াই। তবে যদি আপনার অপারেশনে রোগী থাকে তাহলে সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে ওরকম একজন মহিলা নিয়ে যাবেন। উনি রোগীর সাথে রাতে থাকবে হাসপাতালে তবে না নিলেও অসুবিধে নেই। ওখানে আয়া পাওয়া যাবে।
ধরে নিচ্ছি আপনার পাসপোর্ট ও ভিসা করা হয়ে গেছে। ভিসা করার সময়তো ঠিক করেই রেখেছেন কোন পথে যাবেন। জরুরীভাবে যেতে হলে বিমান তো আছেই।
ইমিগ্রেশন ভীতি
বিমানে যান আর বাসে সরকারকে ৫০০ টাকা ট্যাক্স দিতে হবে। চাইলে আগে থেকেও দিয়ে রাখতে পারেন সরকারী ব্যাংকে নয়তো বর্ডারে গিয়ে ও দিতে পারেন। ক্যান্সার রোগীর জন্যে এই ট্যাক্স লাগে না। যে বর্ডার হয়ে যাবেন সেখানে ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে পাসপোর্ট দিবেন ছবি তুলে ডিপারচার সিল দিয়ে দিবে। তবে চাকরি করলে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটির লিখিত ডকুমেন্টের কয়েকটি ফটোকপি সাথে রাখবেন। আইডি কার্ডও সাথে রাখা ভাল।

বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন ছেড়ে যাওয়া লাগেজ বড় না হলে নিজেই হাতে নিন নয়তো কোন কুলিকে দিন। অবশ্য তাকে কিছু টাকা দিতেই হবে।
হেঁটে ওপাড়ে গিয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশনে যাবেন। খুব সহজ ব্যাপার এসব।
ভয় পাওয়া বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যদি রোগী হাটতে না পারে তাকে ভ্যান গাড়ি করে নিতে পারন। ওপাড়ে গিয়ে স্টেচারে তুলুন। আর এ ধরনের রোগীকে বর্ডার অবধি আনার জন্যে গ্রীন লাইনের কিছু স্লিপিং কোচ আছে। চেকিং এর ঝামেলা হয় না বললেই চলে।
বর্ডার থেকে কলকাতা
যদি সরাসরি কলকাতা অবধি বাসের টিকেট করা থাকে তাহলে বর্ডার পাড় হয়ে ওই কোম্পানির বাসের কাউন্টারে গিয়ে বসবেন। তারাই ডেকে নিবে।
আর বাসের টিকেট করা না থাকলেও এই কাউন্টারগুলোতে গেলে ওরা জনপ্রতি ২৫০ টাকাতে কলকাতা নিয়ে যায়।
আর ট্রেনে যেতে চাইলে হেটে বর্ডার পেরিয়ে একটা অটো(৩০ রুপি নেবে) ধরে চলে যাবেন বনগাঁ স্টেশন। বনগাঁ স্টেশন থেকে সারাদিনই শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে ট্রেন(১০ রুপি নেবে) ছাড়ে। এই ট্রেন শিয়ালদহ পৌছাতে সময় লাগবে ২ ঘন্টা। ফেরার পথেও এভাবে আসতে পারেন। তারপর হেটে বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে গাড়িতে উঠলেন।
বনগাঁও থেকে ট্রেন ধরে শিয়ালদহ নেমে চলে আসবেন কলকাতা নিউমার্কেট। তবে হিলি বর্ডার(দিনাজপুর) দিয়ে গেলে মালদা থেকেই ভেলোরের ট্রেন ধরতে পারেন।
বর্ডারে আপনার কাছে সিম বিক্রির চেষ্টা করা হবে বিভিন্ন প্রলোভনে তবে সেখান থেকে সিম না কেনাই ভাল। এছাড়া টাকা রুপি করানোর জন্যে জোরাজুরি করা হতে পারে কাউন্টারগুলোতে। এখানে টাকার রেট কিছুটা কম তাই টাকা খরচের জন্যে কিছু রুপি করে বাকীটা রেখে দিন।
কলকাতা-ভেলোর ট্রেনের টিকিট আগে থেকে কাটা না থাকলে কলকাতাতে দু’এক রাত থাকতে হতে পারে। টিকেট আগে থেকে কাটানা থাকলে আপনার বাড়তি ২ হাজার টাকা খরচ হবে। তাই দেশ ছাড়ার মাস খানেক আগে থেকেই এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ করে টিকেটর ব্যবস্থা করে নিতে হবে।
তবুও কোন কারণে যদি কলকাতা যেতেই রাত হয়ে যায় বা টিকেটও পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে থাকতে হতে পারে কলকাতায়। মার্কুইস স্ট্রিট এর আশেপাশেই অনেক হোটেল আছে। সেখানে চেক আউট ( হোটেল ছাড়ার সময় ) টাইম দুপুর ১২টা । অর্থাৎ সেখানে দিন কাউন্ট হয় দুপুর ১২টা থেকে পরদিন দুপুর ১২টা । ভাড়া ৫০০ থেকে উপরের দিকে। দু একদিন থেকে টিকেট ম্যানেজ করে নিতে পারবেন।

টাকা/ডলারকে রুপি করবেন কোথায়
তো কলকাতা পৌছে গেলেন। এবার প্রথম কাজ সাথে থাকা টাকা/ডলার গুলো রুপি করে নেয়া। যেখানে ঢাকার বাস গুলো থামে সেটাই হলো মার্কুইস স্ট্রিট। সেখানে অনেক মানি এক্সচেঞ্জ এর দোকান পেয়ে যাবেন। বুদ্ধিমানের কাজ হলো কয়েকটি দোকান ঘুরে সব টাকা বদলে নেয়া। ভুল করেও ভেলোরে গিয়ে বদলাবেন এই চিন্তা মাথায় আনবেন না। সেখানে কলকাতার তুলনায় অনেক কম টাকা দেয়।
সিম কিনবেন কিভাবে
নিউ মার্কেট এলাকাতেই সিম কিনতে পারবেন। সিম কিনতে পাসপোর্ট ভিসার কপি লাগবে। সব সময় সাথে রাখতে হবে কয়েক কপি ছবি, পাসপোর্ট ভিসার ফটোকপি আর কলম। ওখানে ফটোকপি কে আবার জেরক্স বলে। এরপর আরো অনেক কাজে লাগবে এসব।
সিম নেয়ার সময় বলবেন বাংলাদশে কথা বলবেন। আর ভেলোরেও যাবেন। যদি সিম কিনেই কল করে ১২ রুপি করে কাটবে। এরকম না হওয়ার জন্যে প্রোমো রিচার্জ বা পাওয়ার রিচার্জ করে নিতে হবে। এতে করে প্রতি মিনিটে ২ রুপি করে খরচ হবে। তবে যাবেন যেহেতু ভেলোরে আরেকটি সিম ভেলোরে গিয়ে নিতেই হবে। কারণ ভারতে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেলে সিমে রোমিং চালু হয়ে যায় । রোমিং এ কল রিসিভ করলেও প্রায় .৬০ পয়সা মত কেটে নেবে। তবে ইন্টারনেটের কোন রোমিং চার্জ নেই। যদি ভেলোরেই বেশি দিন থাকতে হয় তো সেখানেই একটি সিম কিনে নিতে পারেন। এই সমস্যা আর হবে না।
কলকাতা এসে আবার কলকাতার সিম ব্যবহার করুন। তবে এসব সিমের কোনটার মেয়াদ আপনার ভিসার মেয়াদের চেয়ে বেশি দিন না। সুযোগ থাকলে ভারতের পরিচিত কাউকে দিয়ে ওখানকার লোকাল সিম কেনার চেষ্টা করতে পারেন।
কলকাতা থেকে ভেলোর কিভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে ভেলোর বিমানোর কোন রুট নেই। ঢাকা থেকে আগে যেতে হবে কলকাতা। তারপর কলকাতা থেকে যেতে হবে চেন্নাইয়ে। চেন্নাই থেকে বাস কিংবা ট্রেনে ভেলোরে।
কলকাতা থেকে সপ্তাহে চারটি ট্রেন চেন্নাইয়ে যায়। এই রুটের বিমানের টিকেট যদি আগে করে রাখা যায় তাহলে খরচ অনেকটা কম পরতে পারে। টিকেট ফ্লাইটের যত কাছাকাছি সময়ে কাটবেন তত দাম বাড়তে থাকবে। সম্ভব হলে কলকাতা যাওয়ার আগে বাংলাদেশের কোন এজেন্সিকে দিয়ে টিকেট করে রাখতে পারেন নয়তো চড়া দামেই কিনতে হবে।
ভেলোরের স্টেশনের নাম কাটপাটি স্টেশন। কলকাতা থেকে ট্রেনের টিকেট যদি কাটপাটি স্টেশন পর্যন্ত করা যায় তাহলে খুব ভাল।
কলকাতা থেকে ভেলোরের দূরত্ব ১৭৫০ কিলোমটার। মার্কুইস স্ট্রিটেই(ঢাকার বাস যেখানে নামিয়ে দে) মিলবে বিমানের টিকেট।
ট্রেনে ততকাল নামে একটি ব্যবস্থা আছে। ট্রেন ছাড়ার আগের দিন টিকেট ছাড়ে। পাসপোর্ট নিয়ে স্টেশনে চলে যাবেন। এই ততকালে টিকেট দেয়া হয় ট্রেন ছাড়ার ২৪ ঘন্টা আগে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। তবে ততকালে টিকেটের দাম একটু বেশি।
তবে বিদেশীদের জন্যে আলাদা একটা সুবিধাও রেখেছে ভারতীয় রেলওয়ে। আলাদা কিছু সিট রাখা আছে বিদেশীদের জন্য। এটার জন্যে যেতে হবে ফেয়ারলি প্লেসে। নিউ মার্কেট থেকে কোন অটোকে বললেই নিয়ে যাব। ক্যান্সার রোগীদের জন্য এবং তার এটেন্ডেট (সাথে থাকবেন যে যিনি) এর জন্য টিকেটে ছাড় আছে।
যদি এভাবেও না হয় নিউ মার্কেটের আশে পাশের এলাকা বা ঢাকার বাস গুলো যেখানে থামে সেখানে অর্থাৎ মার্কুইস স্ট্রিটে এজেন্ট এর দোকান পেয়ে যাবেন যাদের কাছে টিকেট পাওয়া যাবে। এরা টিকেট প্রতি ২০০ থেকে ৭০০ রুপি পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নেবে। হাওড়া স্টেশনের বাইরেও এজেন্ট আছে। শুধু রেগুলার দাম থেকে কিছু টাকা বেশি নিবে এই যা। তাই টিকেটের দুশ্চিন্তা অত না।
ট্রেনে এসি ও নন এসি দুটো ভাগই আছে। নন এসির মধ্যে আছে জেনারেল কামরা। যেখানে গাদাগাদি করে যেতে হয়। এটাতে মূলত স্বল্প দূরত্বের লোকজন উঠে থাকে। আর আছে স্লিপার কামরা। এগুলোতে শুয়ে বসে যাওয়া যায়। উপর থেকে নিচে ৩ জন শোবার এবং পাশাপাশি ৩ জন বসার ব্যবস্থা আছে। এসি কামরাতেও একই রকম স্লিপারের ব্যবস্থা আছে। আর আছে ২টায়ার এসি (উপর থেকে নিচে ২ জন শোবার এবং পাশাপাশি ২ জন বসার ব্যবস্থা আছে)। এসি কামরায় একটি বালিশ, একটি বাংকেট/ কম্বল, দুটি চাদর ও একটি ছোট তোয়ালে থাকে।
এসব আবার নন এসিতে থাকে না বলে শীতকালে নন এসিতে গেলে কম্বল কিনে রাখতে হবে বা নিতে হবে।
হাওড়া থেকে ভেলোর
এবার যেতে হবে হাওড়া স্টেশন। হাওড়া মানেই বিশাল স্টেশন। যেতে হবে একটু আগে। হাওড়া নিউ মার্কেট থেকে বাসে যেতে পারেন। অটোতেও যেতে পারেন। তবে অটোতে দেড় থেকে দুশো টাকার বেশি লাগবে না।
ট্রেন কখন ছাড়বে বা কখন কতটা পৌছাল এসব চেক করতে গুগুলে গিয়ে লিখবেন, Train Status তারপর টিকেটে থাকা ট্রেন নাম্বার লিখলেই মিলে যাবে তথ্য।

তবে কোন ট্রেন কত নাম্বার প্লাটফর্মে দাড়াবে এনাউন্স করবে। অবশ্য এত শব্দে সেটা শোনা নাও যেতে পারে। বড় যে ডিসপ্লে গুলো আছে সেখানেও দেখা যাবে কোন ট্রেন কোন প্লাটর্ফর্মে আছে। আর প্লার্টফর্ম পেয়ে গেলে সেখানে ঢোকার আগে নেটিশ বোর্ডে নিজের নাম আর সিট নাম্বার মিলিয়ে নিন। মালপত্র থাকলে তো কুলির সাহায্য নিতেই হবে আর রোগী থাকলে তার জন্যে কিছু প্রস্তুতির ব্যপার আছে তাই আগে যাাওয়া ভাল।
হাওড়া স্টেশনে ২৩টি প্লাটফর্ম আছে। টিকিটেই লেখা থাকবে ট্রেনের নম্বর। প্রতিটি স্টেশনেই স্পিকারে বলা হবে কোন ট্রেন কোন প্লাটফর্মে দাঁড়াবে। আবার বড় বড় স্টেশনগুলোতে ডিসপ্লে বোর্ড আছে। সেখানেও দেখানো হয় কোন ট্রেন কোন প্লাটফর্মে দাঁড়াবে। স্টেশন মাস্টারের রুমের আশেপাশে নোটিশ বোর্ডে বিস্তারিত দেওয়া থাকে।
ট্রেন ছাড়ার ৪০-৪৫ মিনিট আগে থেকে ডিসপ্লে বোর্ডে দেখাবে। যাদের চলাচলে সমস্যা, তাদের জন্য স্টেশনে হুইল চেয়ার পাওয়া যেতে পারে। এই ট্রেন গুলোতে ২৫টি মত বগি থাকে। প্রতি বগিতে সিট আছে ৭২টি করে। কুলিদের থেকে আগেই যদি জেনে নেয়া যায় কোন বগিটি কোন অংশে দাড়াবে তাহলে উঠতে সুবিধা।
ট্র্রেনের ভেতর কি খাবেন?
ট্রেনে উঠে গেলে আগে জরুরী হলো পাশের যাত্রীদের সাথে পরিচিত হয়ে যাওয়া। দুদিনের যাত্রা পথ একটু তো কথা বলতেই হবে নাকি। বাংলাদেশ থেকে যারা যায় তাদের অনেকেই কলকাতার খাবার মোটামুটি মানিয়ে নিতে পারলেও ট্রেনের খাবারে স্বস্তি বোধ করে না। এ কারণে আাগে থেকে খাবার নিয়ে ট্রেনে উঠতে পারেন। তবে সেটাও ওই রাতের। কিছু শুকনো খাবার ও কিনে রাখা যায়।
ট্রেনেও পাওয়া যাবে খাবার। ওয়েটার এসে অর্ডার নিয়ে যাবে আপনার কাছ থেকে। ভেজ নন ভেজ দু ধরনের খাবার পাওয়া যায়। ট্রেনের ভিতরের ভেজ খাবার ভেজ কারি রাইস, ভেজ বিরিয়ানি। ওদিকে নন ভেজ হয় ডিমের বিরিয়ানি অবশ্য ওরা বলে আন্ডা বিরিয়ানি। আর পা্ওয়া যাবে রাইস । এগুলোর দাম ৬০ রুপি থেকে ১০০ রুপির মধ্যে । তবে ঘুমের মধ্যে থাকলে খাবার মিস করে ফেলতে পারেন। এ কারণেই বলি পাশের যাত্রীর সাথে কথা বলে নিন। আবার বড় বড় স্টেশন গুলোতে ট্রেন বেশ কিছুটা সময় দাড়ায়, সে ক্ষেত্রে প্লাটফর্ম থেকেও খাবার নিতে পারেন ।
চা ছাড়া স্বাদের জন্যে আপনার কাছে আর কিছুেই নেই। চা বেশ পাওয়া যায়। মিলবে কফিও। এবার বিপরীত ব্যাপারটা বলি। এসি কামরাগুলোতে বাথরুম ভালই। সাবান, পানি, মগ থাকবে।। তবে নন এসি কামরার ক্ষেত্রে সাবান এবং একটি ছোট মগ নিজের সাথে রাখা ভালো ।

ট্রেন চলতে চলতে দুপাশের সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলাতে পারবেন না সেটা আর বলতে নেই। এর মধ্যে পার হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা ও অন্ধ্র প্রদেশ তারপর তামিলনাড়ু। বাংলাদেশে মাদ্রাজ চিকিৎসার জন্যে অতি পরিচিত শব্দ। কিন্তু আমি সেই মাদ্রাজ ম্যাপে খুজেঁ পাইননি। পরে জানলাম এই তামিলনাড়ুর বর্তমান রাজধানী চেন্নাই যার আগের নাম ছিল মাদ্রাজ।
চেন্নাই থেকে ভেলোর কিভাবে আসবেন
অনেক সময় কলকাতা থেকে চেন্নাই পর্যন্ত টিকিট করা থাকে। কারণ সব ট্রেন কাটপাটি যায় না। সেক্ষেত্রে আপনাকে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে নামতে হতে পারে। আবার কোন কোন ট্রেন চেন্নাই এগমোর স্টেশনে নামিয়ে দেয়।
চেন্নাই থেকে ভেলোরের দূরত্ব ১৩০ কিলোমিটার।
চেন্নাই থেকে বাসে কিংবা ট্রেনে যেতে হবে ভেলোর। চেন্নাই এগমোর স্টেশনে নামলে সেখান থেকে যেতে হবে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে। এরপর চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে কাটপাটি পর্যন্ত ট্রেনে যেতে হবে। প্রয়োজনে স্টেশনের হেল্প ডেস্ক কিংবা পুলিশের সাহায্য নেয়া যাবে। ট্রে
যদি চেন্নাই পর্যন্ত বিমানে যান এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি করে চেন্নাই মফুসিল বাস টার্মিনাল আসতে হবে। এই বাস টার্মিনাল থেকে ভেলোর যাওয়ার অনেক বাস আছে। বাস ভেদে ভাড়া ৮০-১০০ রুপি মত নিবে। ৩ ঘণ্টার মধ্যে ভেলোর পৌছে যাবেন। বাস থামবে ভেলোর নিউ বাস স্ট্যান্ডে। সেখান থেকে একটা অটো নিয়ে চলে আসবেন সিএমসি। ১৫০ টাকার ভিতর হয়ে যাবে।
চাইলে প্রাইভেট কারেও আসা যাবে। দুই থেকে আড়াই হাজার রুপি পর্যন্ত নিতে পারে।

আর ভেলোরের কাটপাটি স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেই দেখবেন অনেক অটো দাড়িয়ে আছে। তারা ৮০ থেকে ১০০ রুপিতে সিএমসিতে নিয়ে যাবে। কাটপাটি হয়ে যে ট্রেন যাবে সেটার টিকেট করতে পারলে সবচেয়ে ভাল। নেমেই অটো ধরে সিএমসিতে যাওয়া যাবে।
ভেলোরে কোথায় থাকবেন? কোথায় খাবেন?
অটো নামিয়ে দিবে সিএমসির আশেপাশের কোন লজের কাছেই। ওদিকে হোটেলের মান ও ভাল। ১৫০ থেকে ৬০০ পর্যন্ত হোটেল/লজ ভাড়া। এর বেশি ও হতে পারে।
সিএমসির একদম পাশের লজ গুলোর ভাড়া একটু বেশি তবে, সাইদাপেট-এর এই পাশটায় ভাড়া একটু কম । তো এখানে আবার খাবেন কি? ট্রেনে দু এক মুঠো যদি খেয়ে থাকেন তাহলে এদিকের খাবার সম্পর্কেই বিশাল অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। তো লজে উঠার আগেই কথা বলে নিবেন রান্নার ব্যাপারে। গ্যাসের চুলা ভাড়া পাওয়াা যাবে তবে হাঁড়ি পাতিল কিছু কিনতেই হবে।
ওদের প্রধান খাবার ইটলি আমাদের ভাতের মতোই। ওই যে টক। তাছাড়া বেশিরভাগ খাবারে কারি পাতা দেয়া থাকে আমরা যে রকম ধনে পাতা দিই ওরকম। এখানে ও বাঙালিদের প্রচুর হোটেল আছে। ওই স্বাদ কলকাতার খাবারের মতোই।
হোটেলে ‍উঠলে কিছু টাকা এডভান্স করতে হয়। যেখানেই থাকুন হোটেল/লজ এর পেমেন্ট স্লিপ গুলো ঠিক মত কালেক্ট করুন এবং সাথে রেখে দিন । পরে এগুলো প্রয়োজন হবে।

হাসাপাতালে প্রি-রেজিস্ট্রেশন
দেশ থেকে আসার সময় দেশের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ডায়াগনোস্টিক রিপোর্ট নিয়ে আসলে সেগুলো সাথে নিবেন। আপনি বাংলাদেশ থেকে গেছেন তাই প্রথমেই সাথে থাকা এটেনেডেন্টকে আইআর অফিস (রুম নং ৯০০) এ রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তবে নতুন রোগী হলেই আগেই প্রি-রেজিস্টেশন করতে হবে। সেটা দেশে থাকতেই নিজে করতে পারেন অথবা যারা ভিসার কাজ করে দেয় সেই দোকান গুলো থেকেও করতে পারেন। অবশ্য অনেক টাকা চেয়ে বসবে। ওখানে না করে সিএমসির আইআর অফিসের পাশের সাইবার ক্যাফে/কম্পিউটার দোকানে ৫০ রুপিতে প্রিরেজিস্ট্রেশন করে নিতে পারবেন। অবশ্য এটা শুধু রোগীর করলেই হয়।

প্রিরেজিস্টেশন এর পর একটি প্রিন্টেড কপি দেয় হবে। এই প্রিন্টেড কপি, রোগী ও এটেনডেন্টের পাসপোর্টের মুল ও ফটোকপি আই আর অফিসে জমা দিতে হবে। রেজিস্ট্রেশন, ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট সবকিছুই এখানে হবে। আপনাকে একটি হাসপাতাল নম্বর দেয়া হবে যেটা আপনার আইডি নাম্বার।
ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট ও ক্রিশ কার্ড
তারপর আমাদের এটিএম কার্ডের মতোই একটি ক্রিশ কার্ড দেয়া হবে। আপনি এবার এপয়েন্টমেন্ট ও পেয়ে গেলেন। তবে অনেক সময় জরুরী এপয়েন্টমেন্ট এর দরকার হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনাকে দ্রুত এপোয়েন্টমেন্টের জন্য আইএসএস বিল্ডিং এর ৪৩২ নাম্বার কাউন্টা্রে যেতে হবে।
যদি ডাক্তার প্রাইভেটে দেখান ৫৫০ টাকা আর জেনারেলে দেখাতে গেলে লাগবে ১৫০ টাকা। পরবর্তী এপয়েন্টমেন্ট যে কোন প্রাইভেট ডাক্তার পরবর্তী ৩ মাস পর্যন্ত ২২০ টাকা। জেনারেল ডাক্তার পরবর্তী ৩ মাস পর্যন্ত ৭৫ টাকা। তবে জেনারেলে দেখানো মানে অনেকটা সময়ের ব্যাপার তাই প্রাইভেটে দেখানোই ভাল।
প্রথমদিন দেখেোর পর কিছু টেস্ট এর রিপোর্ট সেদিনই চলে আাসবে। তাহলে ডাক্তার আপনাকে ৩টার মধ্যে যেতে বলবে সেদিন। আর যদি পরে আসে তাহলে নতুন তারিখ দিবে দেখা করার। তাহলে আপনার আবার এপয়েন্টমেন্ট করাতে হবে টাকা পেমেন্ট করে। ক্রিশ কার্ডটা কি কাজে আসবে আপনার সেই প্রশ্ন নিশ্চয় মাথায় আসছে না। এটি মূলত শুধুমাত্র সিএমসির ডেবিট কার্ড। যার অর্থ হাসপাতালের বাইরে এটা ব্যবহার করতে পারবে না। চিকিৎসা করাতে গেছেন অবশ্যই বেশি টাকা নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই টাকা হাতে নিয়ে অত ভীড়ের মধ্যে ঘোরা তো অস্বস্তির ব্যাপার তার উপর নগদ লেনদেনে টাকা গুণতেই সময় নষ্ট অনেক। তাই সব দিক বিবেচনায় আপনার সকল টাকা হাসপাতালের নির্ধারিত কাউন্টারে জমা দিয়ে ক্রিশ কার্ডে টাকা ভরে নিন। ০.০৫% মত সার্ভিস চার্জ কেটে নিবে। এরপর রিসিপ্ট নিয়ে চলে আসুন। ব্যস ডাক্তারের ফি থেকে ওষুধ কেনা অথবা হাসপাতালে ভর্তি সব কিছুর বিল পেমেন্ট করুন এই কার্ডে। নগদ ক্যাশের লাইন যত দীর্ঘ কার্ডের লাইন তত দীর্ঘ না।
যদি কোন কারণে কার্ড চুরি হয়ে ভয়ের কিছূ নেই। আপনার বিল তো আর তার কাছে নেই। সেটা লাগবে পেমেন্ট করতে। দেশে ফেরার সময় টাকা তুলে নেয়ার সময় কিছু টাকা রেখে দিবেন। পরে এই কার্ড দিয়েই দেশে বসে এপয়েন্টমেন্ট নিতে পারবেন।

স্থানীয় থানায় ‘সি’ ফরম জমা দেয়া
এবার যেতে হবে পুলিশের কাছে। অবশ্য এটা আপনি যখন খুশি যেতে পারেন। প্রথমে ‘সি’ ফরম পূরণ করতে হবে। সেটা হোটেলের ম্যানেজারই করে দিবে। এজন্য আপনাকে পাসপোর্ট ও পাসপোর্ট সাইজের ফটো দিতে হবে। এটা করে দিতে আমাদের থেকে ১৫০ রুপি নিয়ে নিয়েছিল অবশ্য অনেক হোটেলে ৫০ রুপিতেও করেরছে। ‘সি’ ফরম পেয়ে গেলে ফরমের প্রিন্টেড ২ কপি, হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশন ফরম (যদি থাকে), হোটেল/লজের ভিজিটিং কার্ড,পাসপোর্ট ও ফটোকপিসহ যাবেন ভেলোর পুলিশ স্টেশনে। প্রতি পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ২০-৫০ রুপি করে নিতে পারে। ভাই শুধু দেশের পুলিশকে গালি দেয়ার আগে এরপর থেকে আরেক বার ভাববেন।
থানাটা সিএমসি থেকে বামের রাস্তায় সোজা। অটোতে সাত মিনিট আর হেটে ১৫ মিনিট মতো লাগবে। সেখানে কোন ঝামেলা নেই। সব কপি নিয়ে আপনার লজের ভিজিটিং কার্ডে একটা ছাপ্পা মেরে দেবে।
দেশ থেকে টাকা আনবেন কিভাবে?
টাকা ফুরিয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যতীত অন্য যে কোন দেশ হতে ওয়ের্স্টান ইউনিয়ন, মানিগ্রাম এর মাধ্যমে টাকা আনা যাবে। বাংলাদেশের কোন ব্যংক থেকে টাক পাঠানোর সিস্টেম অবশ্য নেই। তবে আপনার হোটেল/লজের আশে পাশেই কিছু হুন্ডি বিজনেস পেয়ে যাবেন। বাংলাদেশে তাদের একাউন্টে কেউ টাকা জমা দিবে। ৩০ মিনিট হতে ১ ঘন্টার মধ্যে আপনি তাদের কাছ থেকে টাকা তুলে নিবেন। ডাক্তার দেখানোর মাঝে মাঝখানে কিছুদিন বিরতি থাকবেই। ততদিনে নিশ্চয় পাশের রুমে যারা আছেন তাদের সাথে সখ্যতা করে ফেলেছেন।

টিপু সুলতানের দুর্গ, স্বর্ণ মন্দির সহ লজ থেকে যে পাহাড় গুলো দেখতে পাবেন সেগুলোতে ঘুরে আসতে পারেন। আর ডাক্তার দেখানো শেষ হলে লজের আাশেপাশেই অনেক এজেন্সি পেয়ে যাবেন। যদি কবে ফিরবেন সেটার সম্ভ্যব্য তারিখ জানা থাকে আগেভাগেই টিকেট করে রাখলে খরচ অনেক কম পরবে। এতদিনে বাকীপথ কি করে যেতে হবে সেই অভিজ্ঞতাও নিশ্চয় হয়ে গেছে।
রোগীর জন্যে শুভকামনা।

Post a Comment

0 Comments