আমি কি ভারতীয়?

আমি কি ভারতীয়?

না। তবে আমার বাবা জন্মেছিলেন পাকিস্তানে আমার দাদা ভারতে আমি বাংলাদেশে। ও হ্যা হিন্দুও কিন্তু না।
ভারতীয় না হলে কেন ভারত নিয়ে এত পোস্ট করি?
এই যে উপরে বললাম দাদা, বাবা ও আমার পরিচয় এভাবে বদলে গেছে সেই ঠুনকো পরিচয় নিয়ে আমি গর্বে ফেটে যেতে পারি না। কে ভারতীয়, কে পাকিস্তানী আর কে বাংলাদেশী বা কে উগান্ডার আমার কাছে খুব বড় বিষয় না।
ও হ্যা ভারত নিয়ে কেন এত পোস্ট করি সেই কথা বলছিলাম।
আচ্ছা কেন আপনি বাংলাদেশী? কেন বাংলাদেশ নিয়ে আপনার এত পোস্ট? সত্তরের নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি তাই তো? নাকি ওই যে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছিল তাই। ধর্মের ভিত্তিতে যদি ভাগ না হতো আপনি কোন দেশের নাগরিক হতেন?
এর আগে বাংলা নামে কোন দেশ ছিল কি? ১৬টি স্বাধীন জনপদ ছিল।
শশাংকের আমলেই পশ্চিমে গৌড় রাজ্যের সীমান্ত ছিল বারাণসী পর্যন্ত। এরপর পাল আমল বারাণসী ও প্রয়াগ থেকে গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার হয়। বিস্তার করেন। অনেকের ধারণা এ সময় নেপাল ও পাল বংশের অধীনে ছিল।
এরপর কর্ণাটক থেকে সেন বংলের শাসকরা এসে উত্তর পশ্চিমবাংলা দখল করে মগধ ও মিথিলা, প্রাগ জৌতিষ, গৌড়, কলিঙ্গ, কাশী রাজ্যও দখল করে নেয়।
এরপর তুর্কি বংশের সময় বাংলায় দিল্লির আক্রমণ হলে একসময় বাংলা চলে যায় দিল্লির অধীন। ১২৮৭ খ্রীষ্টাব্দ অবধি বাংলা ছিল দিল্লির একটি প্রদেশ।
১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দ এই দুশো বছর বাংলা ছিল স্বাধীন।বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা হয় এ সময়।
ইলিয়াস শাহী বংশেরই প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ উড়িষ্যা ও নেপাল এলাকার ত্রিহুত পর্যন্ত বাংলার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর প্রভাব কাশী-বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনিই প্রথম ‘‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’’ উপাধি ধারন করেন।তিনিই প্রথম শাসক যিনি বাংলা নামক বর্তমান যে অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হয় সেসব অঞ্চলকে সর্বপ্রথম ভৌগলিকভাবে একীভূত করেন।
তিনি ১৩৪২ সাল থেকে ১৩৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্বকালে উড়িষ্যা, নেপাল এবং কামরূপ বাংলার সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তিনি এ সম্মিলিত রাজ্যের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং এর অধিবাসীদের বাঙালী নামে অভিহিত করেন।
বাংলার স্বাধীন সুলতানী যুগের অবসান হলে কিছুকালের জন্যে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন বাংলা রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। পরে আফগানদের হাতে তিনি পরাজিত হন। কিছুকাল পর সম্রাট আবার বাংলা দখল করলেও তখন বাংলার বার ভুঁইয়া নামে পরিচিত জমিদাররা স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন। তাদের দমন করা হয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে।
এরপর শের শাহ ‍হুমায়ুনকে বিলগ্রামেরর যুদ্ধে পরাজিত করে দিল্লি দখল করলে বাংলাও দিল্লীর অধীনে চলে যায়। দিল্লির ক্ষমতা নিয়ে ‍শূর বংশের মধ্যে দলাদলি শুরু হলে বাংলার আফগান শাসক মুহম্মদ খান শূর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরবর্তী বিশ বছর বাংলা স্বাধীন ছিল। এরপর আবার মুহম্মদ শাহের পুত্র খিজির খান বাংলা দখল করেন।
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলদের কাছে আফগানরা পরাজিত হলে বাংলায় আবারো মুঘল শাসনের সূত্রপাত হয়। পুরো বাংলা তখনো অধিকার করতে পারেনি মুঘলরা। দীর্ঘ সময়ধরে বাংলার বার ভুঁইয়াদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে তাদের।
এরপর বাংলায় শুরু হয় সুবাদারি শাসন। অনেকটা স্বাধীনভাবেই বাংলার সুবাদারি শাসকগণ রাজ্য পরিচালনা করতেন। সুবাদার শায়েস্তা খান কুচবিহার, কামরুপ, ত্রিপুরা অঞ্চলে মুঘল শাসন বিস্তৃত করেন। এর ধারাবাহিকতায় বাংলায় শাসন ভার পান মুর্শিদখুলি খান। এ সময় আবার বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন শাসন। তাকে পরাজিত করেন বিহারের আলিবর্দী খান। তারপর আসে ব্রিটিশরা।
নাম হয়ে যায় ব্রিটিশ ভারত। তারপর ধর্মের নামে বাংলার এক খন্ড চলে যায় দিল্লির অধীনে আর এক খন্ড চলে যায় করাচীর অধীনে। করাচী থেকে বাংলার পূর্বখন্ড স্বাধীন হয়ে আজকের বাংলাদেশ।
এত কথা কেন বললাম?
যেটা আপনার দেশ বলে এখন বাকীদের অপর ভাবছেন সেই ভূমিও এক সময় আপনার পূর্বপুরুষের দেশ ছিল। আজকে ধর্মের কারণে মাটি ভাগ হতেই সেই ভূমিকে শত্রু ভূমি মনে কররছেন। ইতিহাসের ভেতর গেলে এই পথ গুলো, এই জায়গা গুলোও আমার। শুধু বাংলাদেশের সীমান্তটাই পবিত্র আর বাকী সব অপবিত্র এমন ধারণা আমার নেই। যে পবিত্রতার ধারণা রাজনৈতিক কারণে বদলে যায় অর্থাৎ যে জায়গাকে আজ নিজের দেশ মনে করে কাল ভাগ হলে তাকেই ধ্বংস করে দিতে চাই সেই দেশপ্রেম আমার নেই।
ভারত থেকে আমরা পানি আদায় করতে পারছি না এভাবেও তো কথাটা বলা যায়। পাকিস্তান আমাদের স্বাধীনতা দিচ্ছিল না এরকম কোন বাক্য কি কোথাও দেখেছেন?
তাহলে ভারতীয় যারা বাংলাদেশকে ঘৃণা করে তাদের আমি ভালবাসি?
না। মানুষ যে তাকেই বাসি। বাকী অমানুষদের জন্যে প্রার্থনা থাকে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার। তবে কাউকেই ‍ঘৃণা করি না।
বাংলাদেশী হিসেবে কি মনে হয়?
বাংলাদেশী হিসেবে নয় বাংলার মানুষ হিসেবে ভাল লাগা কাজ করে ইতিহাসের পথ ধরে আমরা দিল্লির অধীনে নয় নিজেদের মত করেই আছি যদিও দুর্মোুখোরা বলবে উগান্ডার(পড়ুন বাংলাদেশের) সরকার দিল্লির অঙ্গুলি হেলনে চলে।
এই পোস্ট কেন?
অনেকেই খুব বিরক্ত আমার ভারত সম্পর্কিত পোস্ট দেখে। দু চারজন জানতেও চেয়েছেন আমি ভারতীয় কিংবা হিন্দু কিনা।
তাহলে আমি চাই কি?
চাওয়া না চাওয়ার কথা বলতে গেলে তো অনেক কথায় আসে। ধরেন, পুরো দুনিয়ার শুরুতে মানুষ ছিল দুজন। সেই দুজন থেকে আজ এত জন। তাহলে তো দেখা যায় আমরা আমাদের আত্মীয়। পৃথিবীটা সবার দেশ। এই মাটি সবার কাছেই পবিত্র। কেউ কাউকে ধ্বংস করতে চা্ওয়ার কথা নয়। দু দুটো পারমাণবিক যুদ্ধ তো হওয়ার কথাই নয়। তারপরও হিংসা হানাহানি চলছে।
আমি রুপকথার গল্পের মতন করে চাই সবাই নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক জানাশোনা বাড়াক। ভারতে বন্যা হয়নি তাই ভারতীয়রা সুখে আছে ভেবে ঘুমিয়ে না পড়ে তারাও নিজেদের দেশের লোকের মতই সমান দুশ্চিন্তা করুক সোমালিয়ার কোন মঙ্গাকবলিত এলাকার মানুষের জন্যে।
কিন্তু ঘুরেফিরে ভারত কেন? পাকিস্তান কেন নয়?
কারণ বাংলার ইতিহাস, ভারতের ইতিহাস সবই আমাদের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ। ভারতকে জানা শোনা মানে নিজেকে জানা নিজের অতীতকে জানা। নিশ্চয় উগান্ডার রাজধানীতে কে কাকে হারিয়েছিল সেটা জেনে খুব একটা কাজ নেই।
পাকিস্তানকে জানার বোঝার চেষ্টা করি কিন্তু নানান কারণে সেটা সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সাথে বাংল ভাষার মাধ্যমে যে আদানপ্রদান সম্ভব করাচীর কারো সাথে সেটা হয় না।
বাংলাদেশ ভারতের সাথে থাকলে খুশি হতাম? নাকি পাকিস্তানে নয় তাই অখুশী?
খুশি অখুশি হওয়ার কিছু নেই। আমার সব কিছুই সাম্রাজ্যবাদের মতন লাগে। এই যেমন আমার সীতাকুন্ডের সমু্দ্রে আমি রাতের বেলা যেতে ভয় পাই। কারণ পুলিশ হয়রাণি করবে কিংবা মাদক মামলায় ফাঁসাবে। তখন মনে হয় ঢাকা সাম্রাজ্যবাদ সীতাকুন্ডকে চেপে ধরেছে। আমার স্বাধীন সীতাকুন্ড দরকার যেখানে কেউ হামলে পরবে না শুয়োরের মতন। আচ্ছা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কিছু বললাম না।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাক আমি চাই না?
অবশ্যই চাই। তবে সেই এগিয়ে যাওয়াতে কেউ পিছিয়ে যাক আমাদের কারণে তা আমি চাই না। যেমন বর্ষায় তিস্তার বাঁধে পানি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গ আমাদের ভাসিয়ে দেয় সেটা তাদের এগিয়ে যাওয়া নয় অমানবিকতা। এরকম এগিয়ে যাওয়া সুস্থ কাজ নয়।
সবশেষে
আমি বাংলা ভাগের বেদনা অনুভব করি। বাংলাকে আমার দেশ মনে করি। কিন্তু উপরে উল্লিখিত বাংলার কোন অংশ আমার দেশ আমি জানি না। কিন্তু এভাবে সংকুচিত করে দেয়া ভূমিতে আমার খারাপ লাগে। হয় পুরো বিশ্বই আমার দেশ কিংবা কোনটাই দেশ না সব রাজনৈতিক দখলদারিত্ব। সেটা নিয়ে যারা গর্ব করে অপরকে ঘৃণা করে তাদের আমি মানুষ মনে করি না।

Post a Comment

0 Comments