আশ্চর্য! কেউ বলেনি সন্ধ্যা নামলে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে

শীত এসে গেছে বুঝতে পারিনি এতদিন। রাতের ট্রেনে ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন যাব বলে বেরিয়েছি। কয়েক পা ফেলতেই শীতল বাতাসের ছোঁয়া। ষোলশহর স্টেশনে সবে তখনো সন্ধ্যা। চোখের পলকেই ভীড় বড় হতে হতে মিলিয়ে গেল ট্রেন আসার সাথে সাথেই।
রাতের শাটলে জানালার পাশে বসা না গেলে কোন গল্পই আর তৈরি হয়ে উঠে না। বড়জোর দরজায় যে দাড়াব সেই জো ছিল না। ট্রেন থামল একেবারে ফতেয়াবাদ স্টেশনে এসে। সেখানে নেমে আবার উল্টো পথের ডেমু হয়ে ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন।
রাতের বেলা বলেই স্টেশনটা ফাঁকা। নতুনপাড়া রাস্তা ধরে হাটা শুরু করে এবার কুয়াশার দেখা মিলল। আসলে কুয়াশার সাথে ল্যাম্প পোস্টের আলো যোগ না হলে ব্যাপারটা ঠিক জমে উঠে না। অনেকটা জঙ্গল বাড়ির মত করে রাস্তার বাঁ পাশে সরকারী অথিথি ভবন আর বাঁ পাশে অনাদরে অবহেলায় গড়ে উঠা জঙ্গল। পথটা ছাড়িয়ে উঠলাম কৌশিকদের মেসে।
পড়ালেখার বারোটা বাজিয়েই চা খেতে বের হওয়া। চা পর্ব শেষ করে আবার ওই একি পথে রাত দুটোয় হাটা আর গলা ছেড়ে গান ধরা। গান আমার আসে না। সেটা নিয়ে আফসোস ও নেই। সাথে বেসুরো গলায় গান গাওয়ার লোকজন থাকলেই হয়ে যায়।
হাটতে হাটতে বাংলাদেশী স্বভাবসুলভ সামনে পেছনে বেশ কয়েকবার দেখতে হলো কোন জনগণের বন্ধু(পড়ুন পুলিশ) এসে হাজির হচ্ছে কিনা। এর মধ্যেই বেশ কজন আর্মি সাইকেলে এদিক ওদিক যাতায়ত করলেন। নেহায়েত জাতীয়তাবাদের কারণেই আর্মি মনে আতঙ্ক জাগালো না।
পরে স্টেশন গিয়ে বিস্তর তর্ক বিতর্ক করে শূণ্য স্টেশনে শব্দের তীব্রতা যখন বাড়ছিলো চোখে পড়ল স্টেশনে ঘুমিয়ে থাকা লোকগুলোকে। ফিরতি পথ ধরে বাসায় এসে আবারো রাজ্যের আলাপ শেষে মুলক সিনেমার সাথেই আমার সকাল হলো।
বন্ধুর বাসার জানালা থেকে পাশের ধানক্ষেত দেখা যায়। ধানক্ষেতের পাশেই একটা বাড়ির মতন করে আছে যার শুরুতে বড় ঘন জঙ্গলে ঘেরা। আমি সিনেমটা দেখছিলাম কয়েক সেকেন্ড আবার আড় চোখে ভোরের স্নিগ্ধ সবুজের দিকে তাকানো। শীত আসলে নতুন প্রাণ পাওয়া এই সকালের মূল আকর্ষণ রোদ ততক্ষণে হাজির হয়ে সোনালী আভা ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই সোনাঝরা সকালগুলোর মায়ায় কত দিন কেটেছে। ইদানীং চাওয়ার তালিকা করতে গেলে দেখা যায় সব ছাপিয়ে শীতের এমন সকালের কথা এসে হাজির। কাউকে কখনো কি জানিয়েছিলাম শীতের মত বাসব!
আমি সিনেমা দেখা বন্ধ করেই বেরিয়ে পড়লাম। দু পাশের রাস্তাঘাট আর লোকজনকে দেখব বলেই মিনিট কুড়ি হেটে বালুচড়া অবধি এসে পৌছলাম। তারপর গাড়ি ধরে অক্সিজেন নেমেই দেখা মিলল গরম সিঙাড়ার।
আমার জীবনের নানান সময়ে নানা রকম ভালবাসা ছিল। গত রোজা পূর্ববর্তী সময় থেকেই সিঙাড়ার প্রতি এই অপরিবর্তিত ভালবাসার জন্যেই সিঙাড়া খাওয়া শেষ করে বের হতে দেখি ভীড় বেড়েছে চারদিকে।
গার্মেন্টসে যাওয়ার জন্যে মহিলারা বেরিয়ে গেছে। রাস্তার পাশে ছোট টুলে বসে কজন সিঙাড়া, চমুচা বিক্রি করছে। মহিলারা দরদাম করে কিনে নিচ্ছে।
একজনকে দেখলাম ছোট সিঙাড়া সরিয়ে বড়টা বেছে নিচ্ছে। আমার মনে পড়ল মার কথা। বাবার ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি মা বেশ কদিন গার্মেন্টেসে গেছিলেন। পাশেই টঙের চায়ের দোকান চা খেতে খেতে এই কর্মব্যস্ততার তাড়ায় মেতে থাকা অক্সিজেনকে দেখলাম।
পরে থ্রি হুইলারে ঝুলতে ঝুলতে বাসার দিকে। কিন্তু দিনশেষে এই বাসাতেই কেন ফিরতে হয়!
কারো কোন ঠিকানা থাকতে নেই। ঠিকানাই হতে পারে দুনিয়ার সবচেয়ে কুৎসিত জিনিস। এরপর বাদবাকী সুন্দরী প্রতিযোগীতার আয়োজন করে নাও।

Post a Comment

0 Comments