যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছো

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছো


কদিন পরেই তোমরা অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছো। মনে রাখবে তোমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে জনগণের টাকায়। রাষ্ট্র তোমার পেছনে ভুর্তকি দিচ্ছে বলেই এত সস্তাতে পড়ালেখা করতে পারছো। তাই কোন অহমিকা যেন তোমাকে পেয়ে না বসে। তোমাদের জন্যে আমার কিছু কথা বলার ছিল। সেগুলো বলতেই এই লেখার অবতারণা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন ধরনের ছেলেমেয়ে দেখবে। কেউ পড়ালেখা করছে চুটিয়ে, কেউ আড্ডা কিংবা রাজনীতি করছে আর কেউ খুব সাধারণ যারা পড়ালেখায় আছে কোন সাতে পাঁচে নেই। যে যেমনই হওনা কেন তোমরা সব সময় সত্যের পথে থাকবে। প্রশ্ন করতে পারো সেই সত্য কেমন? তোমার মেরুদন্ড সোজা রাখাই বড় সত্য। তোমার মেরুদন্ড কারো কাছে বিক্রি করে দেবে না। তোমাকে জানতে হবে তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী নিচ্ছো। এই জায়গা থেকে এমন কোন কাজ করবে না যাতে লোকে তোমাকে নিয়ে লজ্জা অনুভব করে।
কি বলছো কেন বলছো নিজের কাছে পরিষ্কার থাকবে। কারো কথায় দৌড় মারবে না। মনে রাখতে হবে এই রাষ্ট্র যেমন বিশ্বাসীদের তেমন অবিশ্বাসীদেরও। রাষ্ট্রে তুমি যেমন কোন পক্ষের হয়ে বলতে পারো কেউ তার ভিন্ন কিছুও বলতে পারে। কেউ তোমাকে আঘাত করতে না আসলে কাউকে তুমি আঘাত করতে যাবে না। মনে রাখবে কেউ যদি অপরাধ করে ধরাও পরে তুমি তাকে আঘাত করতে পারো না। দেশের প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে। মনে রাখবে একজন চোর কিংবা ধর্ষকের ও মানবিক মর্যাদা তুমি হরণ করতে পারো না।
যদি দেখো কেউ আমাদের দেশ উপহার দেয়া বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে বাজে কথা বলছে তুমি প্রতিবাদ করবে। তবে সেই প্রতিবাদ যেন ন্যায়ের ভেতর থাকে। প্রতিবাদ কখনো অন্যের জীবন হরণ করে হয় না সে কথা মনে রাখবে। তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে যুদ্ধ হলে হামলা করার জন্যে। ‍যুদ্ধ ছাড়া কোন নিরাীহ ব্যক্তির উপর হামলে পড়বে না। মনে রাখবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যদি তুমি হরণ করো কিংবা সেটা বন্ধে বল প্রয়োগ করে সেটা ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। এটা থেকে তুমি বের হতে পারবে না। তোমার পরবর্তী প্রজন্ম এই অসুস্থ সংস্কৃতিতে বড় হবে। তোমার যদি সন্দেহ থাকে কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায় তোমার মাকে গিয়ে ব্যাপারটা বলবে। তোমার মা যা বলে তাই করবে। তোমার মা শিক্ষিত হতে না পারেন তবে মানসিক ভাবে অসুস্থ নন। হলে তোমাকে আদরে বড় করতেন না।
তুমি জানবে একটা সরকার সব রকম ভাল কাজ করতে পারে না। সব খারাপ ও করে না। যেটা যতটুকু করেছে সেটা বলার অধিকার থাকবে সবার। তুমি রাজনীতি করতে পারো তুমি সেটা নাও করতে পারো। তবে তুমি সব সময় মানুষ থাকবে। মানুষের মত আচরণ করবে।
তোমার ভাষা সংযত হবে। সব কিছুতেই তুমি সাধারণের মত আচরণ করে বসবে না। তুমি সংকীর্ণতার গন্ডি ছাড়িয়ে যাবে। তোমার দেশপ্রেম থাকবে ভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি নানান অভিযোগ ও থাকবে। শালীনতার মধ্যেই তুমি সব কিছু বলতে পারো। তুমি জানবে আমাদের কার মগজ কত সুন্দর তা আমাদের মুখের কথায় ও লেখাতে ফুটে উঠে।
তুমি পড়ালেখার পাশাপাশি নানান কিছু করার চেষ্টা করবে। বিতর্কের সংগঠনে যেতে পারো, পত্রিকাগুলোর কিছু পাতা ঘিরে সংগঠন থাকে সেখানেও যেতে পাারো। ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করতে পারো। ছবি তুলতে ভাল লাগলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফি ক্লাবে যুক্ত হতে পারো। এছাড়া সিনেমা ক্লাব, সাংষ্কৃতিক সংসদ, পাখি ক্লাব, ট্যুরিস্ট সোসাইটি সহ আরো অনেক সংগঠন পেয়ে যাবে ক্যাম্পাসে। এছাড়াও টিআইবি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, লিও ক্লাব সহ বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে তুমি যেখানে কাজ করতে পারো। এর বাইরে ভাষা শেখা, কম্পিউটার শেখা সহ নানা রকম কোর্স করতে পারো।
মনে রাখবে ক্লাসে আসা যাওয়া ও নির্দিষ্ট বই পড়া কখনোই তোমার চিন্তাকে প্রসারিত করবে না। হাতের কাছে যা বই পাবে পড়বে। দু চারজন যেমন ভাবে তার চেয়ে ভিন্ন ভাবে ভাবার চেষ্টা করবে। অন্তত নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে। তুমি ভর্তি হয়েই খেয়াল করবে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে গতানুগতিক ধারার। সেই বৃত্ত ভাঙবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগের শিক্ষকের বাইরেও আরো অনেক শিক্ষক আছেন। বোঝার চেষ্টা করবে। যেদিকেই সুযোগ পাও জেনে নেবে। তাদের সাথে কথা বলবে। তোমার জানার জগতটা যত বড় তুমি ঠিক ততটাই বড়।
ক্যাম্পাসে আসা যাওয়ার বাইরেও বেড়ানোর চেষ্টা করবে। সব রকম মানুষের সাথে মিশবে। সব রকম খাবার খাওয়া শিখবে। হল জীবনের সুযোগ হাতছাড়া করবে না। মোটকথা সর্বোচ্চ যত কিছু করা যায় করে নেবে।
যাই করো নিজ স্বার্থের গন্ডির বাইরে যদি বেরোতে না জানো কিংবা নিজের মতের বাইরে বাকীদের গ্রহণ করতে না জানো বুঝবে তোমার পৃথিবীটা খুব ছোট। তুমি ভিন্নতার সৌন্দর্য কি কখনো উপভোগ করতে জানবে না। তুমি এভাবে কখনোই সুখী হতে পারবে না।
তোমার ও তোমার বন্ধুদের মধ্যে নানা রকম ভিন্নতা থাকবে। জানবে সবাই একি রকম পরিবার থেকে উঠে আসেনি। কারো শারীরিক দুর্বলতা কিংবা আচরণগত ত্রুটিতে হাসাহাসি করবে না। কারণ জেনে রাখবে তোমার যে অবস্থান আজ এটা তোমার অর্জন নয়। কারণ তুমি যে সুযোগ যে পরিবেশ পেয়েছো সেটা অন্য কেউ তো পায়নি।
তাই ভাল কোথাও পড়ার সুযোগ পেলে বাকীদের ছোট করে দেখবে না। জেনে রাখবে তোমার অবস্থান এই পৃথিবীতে খুব উঁচুতে হবার সুযোগ নেই। তোমার চেয়ে বড় আরো অনেকেই আছে। তুমি জানবে মনের উদারতার বড় কিছু আর হয় না।
দেশের প্রতি তোমার দায়বদ্ধতা থাকবে। মনে রাখবে দেশে সবাই তোমার মতন দেখতে নয়। তোমার বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়। তাদের সুবিধা অসুবিধার কথা মাথায় রাখবে। তাদের বিপদে সবার আগে যাবে। তাদের কোন কষ্ট দিতে যেও না। কাউকে তো দেবেই না তবে এই শ্রেণীর ব্যাপারে বেশি যত্নবান হবে।
মনে রাখবে তোমার দেশের সংখ্যালঘু ভাল আছে মানে তোমার দেশ ভাল আছে। সবাই ভাল আছে।

Post a Comment

0 Comments