ট্র্যাভেলিং থেকে পরিচয়, অতঃপর প্রণয়-বিয়ে!

টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গিয়ে প্রথম দেখা হয় দুজনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ট্যুরিস্ট সোসাইটি থেকে ট্যুরে এসছে একটি দল।

এনামুল হাসান নৌকার পাটাতনে বসে আছেন। বৃষ্টির ছিটা এসে পড়ছে তার মুখে। কিছুক্ষণ পর পর তিনি গামছা দিয়ে মুখ মুছছেন। মুখটা মুছেই গামছা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী স্টাইলে গলায় ঝুলিয়ে রাখছেন। 

এনামুল হাসানের গামছা ঝুলিয়ে রাখার ব্যাপারটাতে মোটামুটি বিরক্ত হচ্ছেন এই ট্যুরের আরেক সদস্য। নুসরাত বাবর ন্যান্সি। যদিও এর আগে এই ছেলেটিকে তিনি দেখেননি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে ছেলেটির ভেজা গামছা গলায় ঝুলিয়ে রাখাটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না ন্যান্সির।

এরপর তাদের দেখা হয়েছে টিএসসিতে। পরে ফেসবুকে ন্যান্সির মায়ের রক্তের প্রয়োজনে কথা হয়। এরপর তারা উত্তরবঙ্গ সফরে যান। সেখান থেকে বান্দরবান।

হাসান-ন্যান্সিসহ মোট এগারোজন গিয়েছিলেন ট্যুরে। উদ্দেশ্য কেওক্রাডং জয় করবেন। ন্যান্সির প্রথম ট্রেকিং ট্যুর ছিলো সেটি। মাইগ্রেনের ব্যাথা, বমি সব মিলিয়ে অসুস্থই হয়ে পড়লেন তিনি। রুমা বাজার থেকে বগালেক হয়ে চিংড়ির ঝর্না পর্যন্ত গিয়েছিলেন কষ্ট করে। এরপর আর পারলেন না। সবাই চলে গেল কেওক্রাডংয়ের পথে। শুধু ন্যান্সির পাশে থেকে গেলেন এনামুল হাসান। ন্যান্সি ভেতরে ভেতরে দারুণ আন্দোলিত হলেন। তার একটি প্রবাদ বাক্যের কথা মনে পড়লো।

“কাউকে চিনতে চাও, তবে তার সাথে সফরে যাও!”

কেওক্রাডং- এ এনামুল হাসান এবং নুসরাত বাবর ন্যান্সি আবারও এসেছিলেন। এবার আর কোনো সমস্যা হয়নি। বৌদ্ধ পূর্ণিমার রাত। আকাশে ফানুশ উড়ছে। পৃথিবী ভর্তি চাঁদের আলো। এমন একটি রাতে যখন হাসান–ন্যান্সি কেওক্রাডং পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তারা বিবাহিত।

হাসানকে কেউ যখন বিয়ের কথা বলতো সে বলতো, ‘যেই মেয়ে আমার সাথে এক্সপেডিশনে যাবে, জোঁক কামড়ালে আমার পা থেকে জোঁক ছাড়িয়ে দিবে, এমন কাউকেই বিয়ে করবো।’ ন্যান্সি যখন বিয়ের কথা ভাবতো, সেও চিন্তা করতো একজন ট্রাভেলফ্রিকের কথা। যে কালেভদ্রে একদিন পিকনিক করা টাইপ ট্রাভেলার হবে না, যে সত্যিকারের ট্রাভেলার হবে। যে সাথে থাকলে মন খুলে ঘুরা যাবে গোটা পৃথিবী।

তাদের দুইজনের ইচ্ছেই পূরণ হয়েছে। এ বছর বৈশাখের প্রথম দিনে তাদের বিয়ে হয়।

সেই প্রথমবার হাওরের ট্যুর, তারপর দিয়াবাড়ির ট্যুরের ছবি অনেক দিন পর ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো, তাদের দুইজনের সিট ছিলো পাশাপাশি। অথচ তখন তাদের মধ্যে বিরাজমান ছিলো অনর্থক বৈরিতা। কে জানতো, এরপর তারা যে জনমের জন্যে পাশাপাশি থাকবে, এই টিকেট প্রকৃতি তখনই বুকিং দিয়ে রেখেছিল!

ট্রাভেল+সংসার নিয়ে একটা অদ্ভুত ড্রিমের কথা বললেন ন্যান্সি।

“একটা কাভার্ড ভ্যানের মতো থাকবে। সেটার মধ্যেই হবে আমাদের ছোট্টখাট্টো সংসার। আর ওই ভ্যানটা নিয়ে আমরা সব জায়গায় ট্রাভেল করবো ইনশাআল্লাহ্‌। আজ না হয় কাল, একদিন না একদিন এই স্বপ্ন সত্যি হবেই।”

আরব সাগরে ডুবে যাওয়া সূর্য, নরওয়ের আকাশের অরোরা, আফ্রিকার দূর্গম বনজঙ্গল, পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মীর কিংবা এভারেস্টে প্রিয় মানুষটার হাতে হাতটা রেখে হারিয়ে যাওয়া যায়, এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে! আপনার প্রিয় শখ আর প্রিয় মানুষের সাথে একসাথে প্রতি সেকেন্ড বেঁচে থাকা যায়, এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে!

Post a Comment

0 Comments