বাংলা দেশের ভাষা বৃত্তান্ত

ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সন(গ্রিয়ারসন, জর্জ আব্রাহাম (১৮৫১-১৯৪১) ইউরোপীয় ভারততত্ত্ববিদ) ব্রিটিশ ভারতে একটি ভাষা জরিপ( Linguistic Survey of India, 1903-1928) করেন। তার সেই জরিপ অনুযায়ী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ভাষার সংখ্যা ছিল ১৭৯ টি। উপভাষা ছিল ৫৪৪ টি।
তিনি এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোকে চারটি বড় পরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো : দক্ষিণ এশীয় বা অস্ট্রিক (Austric), চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan), দ্রাবিড় (Dravidian) ও ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)। এছাড়া তিনি উপমহাদেশের ভাষাকে আরো তিনটি উপপরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো ইরানীয় আর্য (Iranian-Aryan), ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryan), দরদ-আর্য (Dardic-Aryan)।
হিন্দি ও বাংলা ভাষাকে তিনি স্থাপন করেন ভারতীয়-আর্য পরিবারে। যদিও একি পরিবারে এই দুটো ভাষা কিন্তু হিন্দি ব্যকরণ বাংলা ব্যকরণের অমিলই বেশি। যেমন হিন্দীতে ক্রিয়াপদ ছাড়া ব্যকা গঠন করা যায় না। বাংলাতে আবার সেটা সম্ভব।
এই বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় দ্রাবির পরিবারভুক্ত ভাষার সাথে। তামিল ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা যায়। দ্রাবিড় পরিবারের ভাষার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য এসব ভাষায় জোড়া লেগে নতুন ভাব প্রকাশকারী শব্দ তৈরি হয়। এই শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে দুটি শব্দ একত্রে মিলে সন্ধি তৈরি হয় না। এরকম উদাহরণ বাংলাতেও পাওয়া যায়। যেমন, ছেলে এবং গুলি দু’টি ভিন্ন শব্দ। আমরা যদি বলি ছেলেগুলি তখন একটি তৃতীয় ভাব বোাঝায়। আমরা বাংলাতে ছেলেগুলি না বলে, বলতে পারি, ছেলেরা। এটা হলো আর্যভাষার পদ্ধতি।
ভাষাতাত্ত্বিক শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়(জন্ম : ২৬শে নভেম্বর, ১৮৯০— মৃত্যু : ২৯শে মে, ১৯৭৭ একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ) তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা(পৃষ্ঠা ৩) নামক বইতে বলেছেন বাংলাদেশের পুরনো গ্রাম ও জনপদের নাম দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে অতীতে চলত দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষা।
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ এসেছে আদিবাসী ভাষা গুলো থেকে। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক আছে বেশি। পন্ডিতেরা মনে করেন, সাঁওতালি ভাষা বাংলা ভাষার ব্যাকরণে প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশি শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষা থেকে আগত।
ঠিক এরকম কিছু শব্দ ‍বাংলা থেকে যুুক্ত হয়েছে ইংরেজী ভাষাতে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীরা এ দেশে আসার পর স্থানীয় লোকদের সাথে সরাসরি ইংরেজী ভাষায় কথা বলত না। তারা মিশ্র একটি ভাষা বলত যান নাম হবসন-জবসন ভাষা (Hobson-Jobson)। এই ভাষা থেকেই ইংরেজী ভাষায় যুক্ত হযেছে প্রায় সাতশটি শব্দ।।
জাতি গত ভিত্তিতে বিচার করলে পৃথিবীতে সব অসেমেটিক জাতির ভাষাকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়— আর্য ও অনার্য। বাংলাদেশে আর্য ও অনার্য দুই ধরনের ভাষাই প্রচলিত আছে।। গবেষকদের দাবি বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতি-উপজাতির ভাষা-উপভাষা মিলে অন্তত ৪৫ টি ভাষা প্রচলিত আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন— “বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়াও আছে ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি মাতৃভাষা। এই ৪৫টি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। আবার কিছু লোকের মধ্যে আছে উর্দু ভাষা। আরবি, সংস্কৃত ও পালি ভাষার সঙ্গে রয়েছে ধর্মীয় অনুষঙ্গ। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও জাতিসংঘের প্রভাবে বাংলাদেশে কিছু জায়গায় কার্যকর রয়েছে ইংরেজি ভাষা।” (১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ভোরের কাগজ)
বাংলাভাষা আর্য ভাষার একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা। ইস্টার্ন ইন্ডিক (পূর্ব-ভারতীয়) ভাষা এই ভাষায় বিরাট বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করেছে। বাংলা থেকে ভিন্ন কিন্তু বাংলার সাথেই সম্পকৃত ভাষা গুলোকে দুই ভাবে ভাগ করা যায়।
এক. বাংলা-অসমিয়া ভাষা
এই শ্রেণিতে ১০ টি ভাষা প্রচলিত রয়েছে—

১. স্ট্যান্ডার্ড বাংলা (বাংলা) : বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি ও জাতীয় ভাষা। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে এই ভাষার ব্যবহার করা হয়।
২. চাঁটগাঁইয়া :বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের মানুষ এ চাটগাঁইয়া উচ্চারণে কথা বলে। চাটগাঁইয়া ভাষাকে বাংলার একটি উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি বৃৃহৎ চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষা।
৩. রাজবংশী (রংপুরি) : রংপুর এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক মানুষ এ ভাষা ব্যবহার করেন। এটিও বাংলার একটি উপভাষা।
৪. সিলটি : সিলেট ও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। এ ভাষাকে বাংলার একটি উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৫. অসমিয়া : দেশের পূর্ব অংশের সংখ্যালঘু উপজাতিরা এ ভাষায় কথা বলে। রংপুর বিভাগ ও ভারতের আসামের অফিসিয়াল ভাষা অসমিয়া।
৬. বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী : সিলেট বিভাগ দক্ষিণ অংশে বসবাসকারী মণিপুরী জাতিরা এ ভাষায় কথা বলে।
৭. চাকমা : পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী চাকমা উপজাতিদের ভাষা।
৮. হাজং : ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে এবং বাংলাদেশের ময়মনসিংহের হাজং জাতির লোক এই ভাষাতে কথা বলে।
৯. রোহিঙ্গা : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষার সাথে এই ভাষার সাদৃশ্য বিদ্যমান। তবে এটা একটি পৃথক ভাষা। মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে আগত বাংলাদেশে বসবাসরত উদ্বাস্তুরা এ ভাষা ব্যবহার করেন।
১০. তঞ্চঙ্গ্যা : এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের আরেকটি কথ্য ভাষা। তঞ্চঙ্গা চাকমা ভাষারই একটি অংশ গণ্য করা হয়।

দুই. অবাংলা-অসমিয়া ভাষা
এই শ্রেণিতে ৩ টি ভাষার কথা জানা যায়—
১. পালি : বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র ও পুরাণের ভাষা। ভাষাবিদদের মতে— পালি ও প্রাকৃত ভাষার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। দেশের বৌদ্ধ সংগঠন ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধ গবেষণার কাজে এ ভাষা ব্যবহৃত হয়।
২. ওঁরাও সাদরি : এ ভাষাকে কোঙ্কণী বা কুরুখও বলা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও রাজশাহীতে এবং ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলায় কিছুসংখ্যক ওরাওঁ আদিবাসীরা এ ভাষায় কথা বলে।
৩. বিহারি : বিহারী উদ্বাস্তুদের উচ্চারিত ভাষাকে বিহারি ভাষা বলা হয়।
বাংলাদেশের অনার্য ভাষাসমূহ
বাংলাদেশে প্রচলিত অনার্য ভাষাগুলি প্রধানত ৫ শ্রেণিতে বিভক্ত—
এক. আফ্রো-এশীয় ভাষা
আমাদের দেশের আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষা মাত্র ১ টি—
১. আরবি : দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় নির্দেশনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আরবি ভাষা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

দুই. অস্ট্রো-এশীয় ভাষা
যদিও বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার পরিধি ছোটো। তবে অন্তত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খেমের ও ভিয়েতনামি বংশজাত মানুষদের মধ্যে এজাতীয় প্রায় ৭ টি ভাষায় কথা বলার চল রয়েছে—
১. খাসি : মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ অঞ্চলের খাসিয়া উপজাতিরা এ ভাষার মানুষ। খাসি ভাষা মৌখিক ভাষা। এ ভাষার কোন বর্ণমালা নেই। তবে বর্তমানে এ ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়।
২. প্নার : এটিও খাসিয়ান ভাষা-পরিবারেরই একটি ভাষা। একে জৈন্তিয়া বা শৈতেংও বলা হয় । গারো ও খাসিয়া উপজাতিরে ভাষা এটি।
৩. কোদা : এটি বিখ্যাত ‘মুন্দা’ ভাষা-পরিবারের একটি ভাষা। রাজশাহীর কুদাং ও কৃষ্ণপুরে প্রচলিত একটি উপজাতীয় ভাষা।
৪. সাঁওতালি : মুন্দা-ভাষার মধ্যে সাঁওতালি ভাষার জনসংখ্যা সবচে’ বেশি। রংপুর অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল উপজাতিদের ভাষা সাঁওতালি।
৫. মুন্ডারি : এটিও ‘মুন্দা’ ভাষা-পরিবারের একটি ভাষা। রংপুর অঞ্চলে বসবাসরত মুন্ডা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা।
সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষা দুটিই মুন্ডারি শাখার অন্তর্ভূক্ত। উভয় ভাষারই নিজস্ব কোন হরফ নেই। হাজার হাজার বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে এ ভাষা দুটি। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রঘুনাথ মুর্মু ‘অলচিকি’ নামে সাঁওতাল বর্ণমালা তৈরি করে এবং তা সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
৬. হো : হো ভাষা, বিহার হো বা লংকা কোল নামেও পরিচিত। এটিও ‘মুন্দা’ ভাষা-পরিবারের একটি ভাষা। হো জাতির ভাষা হিসেবে এ-ভাষা স্বীকৃত।
৭. ওয়ার-জৈন্তিয়া : ওয়ারি বা আমভি হলো এই ভাষার অন্যদুটি নাম। রংপুর অঞ্চলের ভারত সীমান্তে ববসবাসরত খেমের ও খাসিয়ারা এ ভাষা ব্যবহার করে।

তিন. দ্রাবিড় ভাষা
১৮১৬ সালে ভারতে ব্রিটিশ কর্মচারী ফ্রান্সিস এলিস আলাদা পরিবার হিসেবে দ্রাবিড় ভাষা নামে যে ভাষাগুলিকে শনাক্ত করেন, তার মধ্য থেকে বাংলাদেশে ২ টি ভাষা প্রচলিত রয়েছে—
১. কুরুখ : এটা কুরুক্স হিসেবেও পরিচিত। রংপুর অঞ্চলে বসবাসরত ওঁরাও উপজাতির অন্যতম একটি ভাষা কুরুখ।
২. মালতো : এ ভাষার দুটি রূপ— কুমারভাগ পাহাড়িয়া ও সাউরিয়া পাহাড়িয়া। অনেক সময় এ দুটিকে আলাদা ভাষাও বলা হয় । এটি রংপুর অঞ্চলে বসবাসরত মালতো উপজাতির ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
চার. জার্মানীয় ভাষা
জার্মানীয় ভাষা-শ্রেণির সবচে’ বড় ২ টি ভাষার হলো জার্মানি ও ইংরেজি । বাংলাদেশে এর ১ টি প্রচলিত—
১. ইংরেজি : ব্যবসা, মিডিয়া ও শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাদেশে ইংরেজির প্রচলন সততই অনেক বেশি ।
পাঁচ. তিব্বতি-বর্মী ভাষা
তিব্বতি ভাষা-পরিবারের প্রধানতম ২ টি শ্রেণি হলো— চীনা-তিব্বতি ও তিব্বতি-বর্মী। তিব্বতি-বর্মী ভাষা, যাকে সিনো-তিব্বতী বা ট্রান্স হিমালয়ান ভাষাও বলে, বাংলাদেশে এই শ্রেণির অন্তত ১৪ টি ভাষার হদিস মেলে । বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতি, আদিবাসী ও উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী এ ভাষাগুলি তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন।

১. আরাকানি : অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ এ ভাষাটি বাংলাদেশে রাখাইন ভাষা নামে পরিচিত। এটি মূলত ‘মারমা’র একটি উপভাষা। বাংলাদেশের পটুয়াখালী, কক্সবাজার, বরগুনা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাখাইন জনগোষ্ঠীর মানুষ এ ভাষায় কথা বলে।
২. আতোং : কচ, রাভা, বোডো ও গারো ভাষার সাথে এ ভাষার নিবিড় সম্পর্ক আছে। যশোরের ব্রহ্মপুত্র নদ উপকূলের গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা এ ভাষা কথা বলে।
৩. শো : শেন্দুও বলা হয় । কারও শো ভাষা হলো শেন্দুর উপভাষা। তবে সঠিক মত হলো, এই ভাষার চারটি পৃথক কথ্যরূপ পরিলক্ষিত হয়— আশো (খিয়াং), বুলখাও, চিনবোন এবং শেন্দু। ‘অশো চিন’ নামে চীনা-তিব্বতি ভাষাশ্রেণিতেও এই ভাষার অবস্থান রয়েছে ।
৪. চাক : চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত চক জনগোষ্ঠী যে ভাষায় কথা বলে সেটি চাক ভাষা নামে পরিচিত।
৫. কোচ : বাংলাদেশের কোচ জাতির মানুষেরা এই ভাষাতে কথা বলেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের পাবনা, বগুরা, রাজশাহী, মালদহ, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলায় কোচরা বাস করে।
৬. গারো : গারো পাহাড় এলাকার অধিবাসীদের প্রধান ভাষা। বাংলাদেশের টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোণা এবং ভারতের মেঘালয় অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত গারোদের মাতৃভাষা। লালং বা পাত্র কে গারো ভাষার অংশ মনে করা হয়।
৭. দারলং : কুকি ভাষার শ্রেণিভুক্ত একটি ভাষা। বাংলাদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা লোকেরা এ ভাষা ব্যবাহর করে।
৮. বর্মী : বর্মী ভাষা মূলত মিয়ানমারের ভাষা হলেও বাংলাদেশের মিয়ানমার সীমান্তের বিপুল পরিমাণে জনগণ বর্মী ভাষায় কথা বলে।
৯. মেগাম : বাংলাদেশে এই ভাষায় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী কথা বলে থাকে। এটা গারো ভাষার কাছাকাছি একটি ভাষা হলেও খাসি ভাষার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং আবেং ভাষার সাথে ৭-৯% ভাষাগত মিল আছে। চট্টগামে এই ভাষাভাষীর ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর খোঁজ পাওয়া গেছে ।
১০. মৈতৈ : মৈতৈ ভাষা মেইতেই লোন্‌, মেইতেই লোল্, পাংগাল-লোল ভাষা নামেও পরিচিত। যদিও সিলেটের এই মৈতৈ ভাষাকে মণিপুরী ভাষা হিসেবে ডাকা হয়, এটি মণিপুরে প্রচলিত আরেকটি ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা অপেক্ষা স্বতন্ত্র।
১১. মিজো : মিজোভাষীরা মূলত মিজোরামে বাস করলেও এর বাইরে ভারতের মণিপুর ও ত্রিপুরা অঙ্গরাজ্যে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং উত্তর-পশ্চিম মায়ানমারের চিন পর্বত অঞ্চলে মিজো ভাষাভাষীরা বাস করে।
১২. ম্রু : বাংলদেশের মুরং বা ম্রো জাতিগোষ্ঠির ভাষা হলো ম্রু বা মুরু । ম্রোরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন জাতি এবং বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতি হিসেবে পরিগণিত।
১৩. পাংখুয়া : চট্টগ্রামে বসবাসরত কুকি উপজাতী জনগোষ্ঠী ব্যবহার করা ভাষাই হলো পাংখুয়া । এটি পাংখু বা পাংখোয়া অথবা পাং নামেও পরিচিত।
১৪. রিয়াং : চট্টগ্রামে বসবাসরত কেরেন জনগোষ্ঠীর ভাষার নাম রিয়াং। একে কখনো লাং বা ভিংচিয়া ভাষা বলে পরিচয় দেয়া হয় । কখনো একে আলাদা ভাষা বলা হয়।
১৫. মারমা : মারমাও বাংলাদেশে প্রচলিত একটি ভাষার নাম। রাখাইন ভাষাকে মারমা ভাষার একটি অংশ মনে করা হয়।

ছয়. চীনা-তিব্বতি ভাষা

এ নিয়ে মতান্তরের শেষ নেই । চীনা-তিব্বতি ভাষাগুলো বহুক্ষেত্রেই তিব্বতি-বর্মী ভাষা বলে বর্ণনা করা হয়। এর কারণ চীন অঞ্চল ও বার্মার সীমান্তের জনগোষ্ঠীদের ভাষাকে নির্ণয় করতে না পারা। অর্থাৎ— অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে জাতিগত দিক থেকে যারা তিব্বতি-বর্মী বা বার্মা অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসী, তারা ভাষাগত দিক থেকে চীনা-তিব্বতি। প্রতিবেশের কারণে এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়। শো ভাষার দিকে তাকালে দেখা যায়, এদের যেই শ্রেণিটা অশো চিন ভাষায় কথা বলে, তারা আসলে চীনা-তিব্বতি। কিন্তু ভাষার বিচারে সেটি তিব্বতি-বর্মী । কিংবা এর বিপরীতও হতে পারে।
বাংলাদেশে চীনা-তিব্বতি ভাষার সংখ্যা অন্তত ৫ টি—

১. ককবরক : বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বসবাসরত বসবাসরত ত্রিপুরি জাতির লোকদের মাতৃভাষার নাম ককবরক। একে ত্রিপুরি বা ত্রিপুরা বা তিপ্পেরা ভাষাও বলা হয়।
২. বম : ভাষা বম নৃগোষ্ঠীর ভাষা। বমদের বসবাস মূলত বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায়। এ ছাড়া রাঙামাটির বিলাইছড়িতেও কিছু কিছু বম বাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এদের লোকসংখ্যা ৬ হাজার ৯৭৮। বম ভাষা একাধিক নামে পরিচিত, যেমন— বম, বন, বাওম চিন।
৩. ফালাম চিন : এ ভাষার বিখ্যাত উপভাষা হলো জান্নিয়াত ও চোরেই। কন্দ জাতির ভাষা এটি।
৪. হাকা চিন : ২০০০ সালের তৈরি ক্রিশ্চিয়ান ডাটাবেজ অনুসারে বাংলাদেশে এই ভাষাভাষীর সংখ্যা ১২৬৪ প্রায়। ধর্মের দিক থেকে তারা খ্রিষ্টান। জোখুয়া ও লাই ভাষা এই ভাষার উপভাষা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাত্র উপাজাতিরা এ ভাষার মানুষ।
৫. খুমি : একে খুমি চিনও বলা হয়। বাংলাদেশের বান্দরবন জেলাতে প্রচলিত। খুমি (খেমি বা খামি) জাতির ভাষা খুমি। ২০১১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে সংখ্যায় এরা প্রায় ৩৩৬৯ জন।
এ ছাড়া উসুই বা উশোই নামে পার্বত্য চট্টগ্রামের এরকটি ভাষার কথা জানা যায়, যে ভাষার ভাষাভাষীর সংখ্যা অন্তত ৪ হাজার হবে বলে ধারণা করা হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে ‘উসাই’ জাতির ভাষা মনে করেন এবং নৃতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১১ সালের প্রতিবেদনে তাদের জনসংখ্যা মাত্র ৩৪৭ জন বলা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন ককবরক বা তিপ্পেরা ভাষার আরেক নাম উসুই। এমতটিকে সঠিক বলে মনে হয় না, কেননা, ককবরক হলো তিব্বতি-বর্মী ভাষা শ্রেণির একটি ভাষা, অন্যদিকে উশোই ইন্দো-আর্য ভাষা শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা ভাষার উপভাষাসমূহ : বাংলা ভাষার যে উপভাষাগুলো আছে সেগুলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষা দলের অংশ।
রাঢ়ী (নদীয়া,বর্ধমান সহ দক্ষিণবঙ্গ), বরেন্দ্রী (মালদহ, মুর্শিদাবাদ সহ উত্তর-পশ্চিম বাংলা), ঝাড়খণ্ডী (বাঁকুড়া, মেদিনীপুর সহ ঝাড়খন্ডের কিছু অংশ ), বরিশালী (বরিশাল অঞ্চল), নোয়াখালীয়া (নোয়াখালী অঞ্চল), রংপুরী (রংপুর অঞ্চল), খুলনাইয়া (খুলনা অঞ্চল), ময়মনসিংহী (ময়মনসিংহ অঞ্চল), সিলেটি (সিলেট অঞ্চল) , চাঁটগাঁইয়া (চট্টগ্রাম অঞ্চল) এবং নাটোরী ভাষা (নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ অঞ্চল) পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রধান কথ্য উপভাষা।
বাংলা ভাষায় অঞ্চলভেদে ভিন্ন উচ্চারণ হয়ে থাকে, যেমন: পূর্ববঙ্গের ভাষায় বলা হয়, 'আমি অহন ভাত খামু না' যা পশ্চিমবঙ্গে বলা হয়, 'আমি এখন ভাত খাব না।'
ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষার শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। উচ্চারণের ভিত্তিতে বাংলা উপভাষা পাঁচ প্রকার:
রাঢ়ী উপভাষা, বঙ্গালী উপভাষা, বরেন্দ্রী উপভাষা, ঝাড়খণ্ডী উপভাষা, রাজবংশী উপভাষা। এই পাঁচিটি ছাড়াও কিছু ভাষাবিদগণের মতে সুন্দরবনী উপভাষা একটি স্বতন্ত্র উপভাষা।
১. রাঢ়ী উপভাষা : পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বাঁকুড়া (পূর্ব), হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই উপভাষার প্রচলন লক্ষ করা যায়। এই উপভাষাকে ভিত্তি করে প্রমিত বাংলা গঠন করা হয়েছে। মানে আমরা যে সাধুু ভাষা বলি কিংবা যে ভাষা আমরা সরকারি ভাবে ব্যবহার করি তার ভিত্তি এই অঞ্চলের ভাষা।

শব্দের যে কোনো স্থানে ব্যবহৃত 'অ' উচ্চরিত হয় ‘ও’ এর মত। যেমন- অতুল >ওতুল, মধু >মোধু, পাগল > পাগোল, মত > মতো। 'ন' 'ল' এর মত এবং 'ল' 'ন' এর মত উচ্চারণ হয়। যেমন- নৌকা >লৌকা, নয় >লয় ;লুচি >নুচি, লেবু >নেবু। কর্তৃকারকের বহুবচনে 'গুলি', 'গুলো' এবং অন্য কারকের বহুবচনে 'দের' বিভক্তির প্রয়োগ। যেমন- মেয়েগুলো, পাখিগুলি, রামেদের।
২. বঙ্গালী উপভাষা এটি অধুনা বাংলাদেশের প্রধান উপভাষা।ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, খুলনা বিভাগ, বরিশাল বিভাগ, বৃহত্তর কুমিল্লা-নোয়াখালী এবং ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে এই উপভাষা। ভাষাভাষী সংখ্যা বিবেচনায় এই উপভাষাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়্

এ >অ্যা (কেন > ক্যান ) , উ >ও (মুলা > মোলা), ও >উ (দোষ >দুষ), র >ড় (ঘর >ঘড়) ধ্বনিতে পরিবর্তন ঘটে। গুল, গুলাইন দিয়ে গঠিত হয় বহুবচন পদ। যেমন- বাত গুলাইন খাও। গৌণকর্মে 'রে' বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন- আমারে মারে ক্যান।
৩. বরেন্দ্রী উপভাষা উত্তরবঙ্গের মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের লোকমুখের ভাষা হল এটি।
অপ্রত্যাশিত স্থানে 'র' আগম বা লোপ পায়। যেমন আম কে বলা হয় রাম। রস কে বলা হয় অস। গৌণকর্মে 'কে', 'ক' বিভক্তি দেখা যায়। যেমন- হামাক দাও।
৪. ঝাড়খন্ডী উপভাষা : পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ-পশ্চিম বাঁকুড়া ও সিংভূম অঞ্চলে এই উপভাষা প্রচলিত।

প্রায় সবশব্দেই 'ও'-কার পরিণত হয়েচে 'অ'-কারে। যেমন- লোক >লক, মোটা >মটা, ভালো >ভাল, অঘোর >অঘর। ক্রিয়াপদে স্বার্থিক 'ক' প্রত্যয়ের পয়োগ হয়। যেমন- যাবেক, খাবেক, করবেক।
নামধাতুর প্রচুর ব্যবহার হয়। যেমন- জাড়াচ্ছে, গঁধাচ্ছে।
৫. রাজবংশী উপভাষা : পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার; আসামের গোয়ালপাড়া, ধুবড়ী অঞ্চল ও বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে এটি প্রচলিত। বরেন্দ্রী ও বঙ্গালী উপভাষার মিশ্রণে এই ভাষা গড়ে উঠেছে
'র' এবং 'ড়' ও 'ন' এবং 'ল'-এর বিপর্যয় হয় বিভিন্ন শব্দে।। যেমন- বাড়ি >বারি, জননী >জলনী।
শব্দের শুরুতে শ্বাসাঘাতের জন্য 'অ', 'আ' রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন- অসুখ >আসুখ, কথা >কাথা।
'ও' ধ্বনি কখনো কখনো 'উ' হয়ে যায়। যেমন- কোন >কুন, বোন >বুন।
যৌগিক ক্রিয়াপদে 'খোয়া' ধাতুর ব্যবহার আছে। যেমন- রাগ করা >আগ খোয়া।
৬. নাটোরী ভাষা :এটি নাটোর অঞ্চলের ভাষা। এ ভাষা বরেন্দ্র ও রাজবংশীয় ভাষার বেশ কিছু শব্দ ও নিজেস্ব কিছু শব্দ বা বাচন রয়েছে। বিশেষ এক ধরণের আঞ্চলিক টানের ভাষা নাটোর ছাড়াও পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও তদসংলগ্ন এলাকার মানুষের কথ্য ভাষা।
"ল" এর পরিবর্তনে "ন" ও "ছ" এর পরিবর্তে "চ", "স" এর পরিবর্তে 'চু"। যেমন- লেজ > নেজ, যাচ্ছি > যাচ্চি, যাচ্ছিস > যাচ্চু।বলার ধরণ কোথায় যাচ্ছিস > কুনটি যাচ্চু, কোথা থেকে এলে > কুটি হতে আলু,
ক্ষেতে যাবি না > ক্ষ্যাতে যাবু লা, এ রকম করছ কেনো > ইংকা করিচ্চু ক্য রে।

Post a Comment

0 Comments