বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-শিলিগুড়ি ট্রেন যেভাবে হুমকি হয়ে উঠে

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-শিলিগুড়ি ট্রেন যেভাবে হুমকি হয়ে উঠে

কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি(দার্জিলিং জেলা) পর্যন্ত নতুন ট্রেন রেলপথ হবে জেনে দেশীয় ভাইদের অনেক উদ্বেগ লক্ষ্য করলাম। সার্বভৌমত্ব চলে গেছে হেন তেন আরো কত কি।
রেলপথটি চালু হলে কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত(যশোর) হয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে ট্রেন। তারপর বাংলাদেশের পার্বতীপুর, দর্শনা, সৈয়দপুর, নীলফামারী, তোরণবাড়ি, দোমার, চিলাহাটি(রংপুর জেলার নিলফামারী) হয়ে ট্রেন যাবে ভারতের হলদিবাড়ি(কুচবিহার)। সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি।
অবশ্য এই রুটে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ট্রেন চলত। তার আগেও যখন ভারত-পাকিস্তান নামে কিছুই ছিল না তখন থেকেই ব্রিটিশ নির্মিত এই রুটে যাতায়াত করতো বাংলার মানুষ।
যশোর থেকে শুরু করে পাশ্ববর্তী উত্তর চব্বিশ পরগণা এদিকে চুয়াডাঙ্গা ও পাশের জেলা নদীয়া একদম উত্তরে লালমনিরহাট ও পাশের জেলা কুচবিহার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। সে সময় দেখেছি সীমান্তবর্তী এসব জেলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি সবটাই একই রকম।
বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলা এক সময় নদীয়া জেলার অংশ ছিল। তাদের মধ্যকার অমিল বলতে ওই তীব্র জাতীয়তাবোধ।
এরা বিশ্বাসের কারণে আজ কেউ ভারতীয় কেউ আবার বাংলাদেশী। তবে বিশ্বাস বলেও নয় গরিব জাতির স্যার রেডক্লিফ যে অংশকে ভারত বলে রায় দিয়েছেন সেটােই ভারত হয়ে গেছে। যে অংশকে পাকিস্তান বলেছেন সেটাই পাকিস্তান। আর সেই মানচিত্রের উপর দাড়িয়ে পরে আমরা বানালাম বাংলাদেশ। তবে পুরো ব্যাপারটাই দাড়িয়ে আছে ধর্মের উপর। ধর্ম ইসলাম হওয়ার কারণে এই ভূখন্ড বাংলাদেশ এবং বাকীরা শত্রু ও সার্বভৌমত্বের জন্যে হুমকি। অবশ্য একই জিনিসের উপর দাড়িয়ে ভারত রাষ্ট্র সেক্যুলার সাজার চেষ্টা করে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে গালাগাল করা এই তিন দেশের মানুষ ব্রিটিশ স্যারের ঠিক করে দেয়া মানচিত্রকে দেশ ধরে নিয়ে বিশাল গর্বের স্বাধীনতাও উদযাপন করে থাকে। ব্রিটিশরা খারাপ কিন্তু ব্রিটিশদের ঠিক করে দেয়া মানচিত্র খুবই চমৎকার।
সমস্যা এই একই ভাষার একই সংষ্কৃতির মানুষ হয়েও আমরা কাছে আসতে পারি না ভালবাসতে পারি না কিন্তু নিজের সংস্কৃতির সাথে মিল না থাকার পরও দেশের দূর থেকে দূরতম জেলার মানুষকে আপন ভাবছি।
এই সংকীর্ণ সীমান্তবোধ ছেড়ে আমাদের নিজেদের মাটি নিজেদের ঐতিহ্যকে জানা দরকার।
দেশের একটা ভাল সংজ্ঞা দিয়েছেন সুষুপ্ত পাঠক ভাইয়া।
তিনি বলেন, ‘দেশ’ জিনিসটা আসলে কি? এই যে আমি যে শহরে জন্ম নিয়েছি, তার কয়েক মিলোমিটার ব্যাতিত গোটা মানচিত্রের কোন স্থানটা আমার? সিলেটী নোয়াখালী ভাষা আমার কাছে ল্যাটিনের মতই দুর্বোধ্য! যে জেলা শহরে আমার জন্ম সেই জেলার সবটুকুও আমার নয়। ঐ যে মাত্র কয়েক মাইল, তার জন্যই অভ্যস্থতা আর নষ্টালজিয়ার মিশেলে একটা আবেগ কাজ করে বড়জোর। নইলে আপনার এই নিজের শহরে এক টুকরো জমি না থাকলে আপনার ঠাই হবে পথে। গ্রামের ছিন্নমূল মানুষ শহরে আসলে নাম পায় ‘মফিজ’। কোলকাতার চাইতেও ঢাকা অনেক পুরোনো শহর বলে গর্ব করা আপনি বাসা ভাড়া দিতে না পারলে রাস্তায় এসে দাঁড়াবেন।
‘দেশ’ একটা কৃত্রিম জিনিস আর ‘দেশপ্রেম’ হচ্ছে ভাওতাবাজীর নাম! নেতাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে দরকার ‘দেশপ্রেম’ জাগানো। ‘দেশ’-কে নিরাপদে টিকিয়ে রাখতে দরকার সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীকে পুষবে ঠেলাগাড়ি আর মুট বয়ে চলা শ্রমিক, রোদে বৃষ্টিতে পুড়ে কঙ্কালসার কৃষক…। ‘দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে’ এটা আপনি বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানে রোজ নেতাদের মুখে শুনবেন। এই তিনটা দেশেই অশিক্ষিত মূর্খ মানুষের বাস, এদের আপনি ধর্ম আর দেশ দিয়ে বুঁদ করে রাখতে পারবেন।
এই দেশের সংকীর্ণ ধারণা থেকেই আমরা বৃহত্তর নদীয়ার মানুষের জীবন যাত্রার ভিতর কাঁটাতার তুলে দিয়েছি। তাদের শত শত বছরের শিকড়ের সম্পর্ককে অস্বীকার করে বসছি এবং মারাত্মক বাজে সরলীকরণ করছি।
ব্যাপারটা একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক লিখেছেন কলকাতার কোন দাদার কাছে গেছেন। দুপুর পেরিয়ে গেলেও তিনি খেতে বলেননি এবং পরদিন দুপুরে দাওয়াত দিলেন সেদিন আর কল করেননি। স্যার ইঙ্গিত করলেন ভারতের লোকজন এমন কিনা। স্যারের এই পোস্টে এক গর্বিত বাংলাদেশী কমেন্ট করলেন, পুরো ভারতের সব জায়গার মানুষই এরকম। কিন্তু বেচারার হয়ত এই জীবনে পুরো বাংলাদেশই দেখার সুযোগ হবে না।
হায় তাকে কি করে বোঝাই বাংলাদেশের দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষটার যে চিন্তা ধারা বা রুচি ঠিক একই রুচি কাঁটাতারের ওপাড়ে থাকা দুই দিনাজপুরেরও (উত্তর ও দক্ষিণ)। দেশ দিয়ে কারো চরিত্র নির্মিত হয় না।
ভারত রাষ্ট্রে বিশ্বাস করলেই কেউ খুব ইসলামবিদ্বেষী হবে কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ঈমান রাখলেই সবাই অতিথিপরায়ান হয়ে যায় ব্যাপারটা তো এমন না।
মানুষকে আমি বোঝার চেষ্টা করি তার এলাকা দিয়ে। কেউ যখন বলে তার বাড়ি সিলেট তার পাশ্ববর্তী আসামের জেলার নামটা জানার কথা চেষ্টা করি। কারো বাড়ি ফেনী বললে আমি ভাবি ত্রিপুরার কথা। যদি কেউ জানায় তার বাড়ি লালমনিরহাট ভাবি পাশের কুচবিহারের কথা।
এগুলো তো আলাদা কোন সত্ত্বা না। ধর্ম নামক একটা অদ্ভুত জিনিসের উপর ভিত্তি করে কাঁটাতার তুলে দিলেই বুঝি মানুষের শত বছরের যোগাযোগ ভুল হয়ে যায়? শত্রু হয়ে যায়?
আপনার দেশের যে এলাকাকে আজ পবিত্র মনে হয় কাল কোন শয়তানের কারণে সেটা দু টুকরো হলে আপনি সেই এলাকাকে ঘৃণা করবেন? আপনার গ্রামকে দু টুকরো করে দেয়া হলে বাকী অংশকে আপনি ধ্বংস করে দিতে চাইবেন?
এসব ব্যাপার প্রত্যেকটা এলাকার নিজস্ব এভাবে ভাবতে না পেরে বৃহৎভাবেই ভাবতে হবে কেন?
সে যাই হোক এত আলাপ ছেড়ে এই রেললাইন তৈরিকে সাধুবাদ জানাই।
এমন একটা বিশ্ব চাই বাংলাদেশের একটা স্টেশন থেকে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে ট্রেন ছাড়বে সেটা আসাম, চীন হয়ে রাশিয়া ঢুকবে। একইভাবে প্রত্যেকটা দেশ থেকেই পাশের দেশে ট্রেন থাকবে। কোন দেশাত্ববোধ মানুষে মানুষে মিলন ঠেকাতে পারবে না।
আমরা যারা চট্টগ্রামের মানুষ বাংলাদেশ মানেই দেখা যায় ‍ঢাকা বুঝি ওদিকে কিছু সিলেট বা উত্তরবঙ্গ। অথচ আমাদের সবচেয়ে কাছের বা বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার আগে যে উন্মুক্ত জনপদ ছিল ত্রিপুরা, আরাকান ও মিজোরামের সাথে সেই ইতিহাস থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে হতে ঢাকাকে সর্বজ্ঞান করতে শুরু করেছি।
আরাকান রাজসভায় সাথে রেঙ্গুন শহরের সাথে আমাদের চট্টগ্রামের যে নিবিড় সম্পর্ক ও বিয়ে শাদির কারণে আমাদের মধ্যকার যে নৈকট্য সেটা তো উত্তরবঙ্গের কোন জেলার সাথে নেই তাই না?
শুধু এই একটা সীমান্ত প্রেমের কারণে আমাদের সীমান্তগুলোতে মানুষ মরছে। শরনার্থী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সভ্যতা উন্নত হয়েছে দাবি করে মুখে খই ফোটানোর পরও সীমান্তে সৈন্য রাখতে হচ্ছে। তারা মরলে গর্বিত হতে হচ্ছে। আবার আমার দেশের সৈনিক ওদের দেশের তিনজনকে মেরে ফেললে আনন্দিত হতে হচ্ছে। আরে ভাই মরলো তো মানুষ। কারো বাবা মরল কারো স্বামী মরল। আপনার দেশ, দেশপ্রেম মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেল?
এই অসুস্থ বিকৃতমনা মানুষগুলোকে আমরা সুন্দর শব্দ দিয়ে বলতে হচ্ছে দেশপ্রেমিক। ব্যাপারটা খু্বই হাইস্যকর।
একটু দেশপ্রেম থেকে বের হয়ে মানবিক হতে অসুবিধাটা কোন জায়গাতে?

Post a Comment

0 Comments