উপমহাদেশে ঘৃণা চর্চার দিনগুলি

উপমহাদেশে ঘৃণা চর্চার দিনগুলি

কথাগুলোর সাথে আজ নতুন করে পরিচিত তা নয়। শুধু পারিনি সমানে কথাগুলো নিজেও বলতে। অবশ্য বলবও বা কি?
ইউটিউবে উপমহাদেশের নানান বিষয় নিয়ে ভিডিও দেখার পাশাপাশি কমেন্টগুলো নিয়মিত পড়ি। চেষ্টা করি গণমানুষের চিন্তা বুঝতে। যদিও ইউটিউব ব্যবহারকারীরাই সেই বোঝার মানদন্ড কিনা সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে যারা ইন্টারনেট সংযোগের কাছাকাছি এসছেন এবং নিজের জিমেইল ব্যবহার করে একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলে বাংলা/বাংলিশ/ইংরেজীতে দু চার কথা লিখতে পারেন তারা সমাজের একটা অগ্রসর শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নিতে হয়। যারা মোটামুটি পড়ালেখার সংস্পর্শে এসছেন এবং নানান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মত জানান দেন এবং তাতে অন্যদের প্রভাবিত করার ও একটা সুযোগ থাকে তাদের। এই শ্রেণীকে আগ্রাহ্য করার উপায় কি আছে?
দেশভাগ সহ বর্তমান সময়ে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কি হাল হকিকত সেটা নিয়ে নানান ভিডিও আছে। নানা ভাবে একে অপরকে অপদস্ত করার একটা চেষ্টা জারি আছে। বাংলাদেশের কেউ একজন একটা টকশোর অংশ শেয়ার করেছে যার ক্যাপশন ‘ ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র হতেই পারে না তারা আমাদের চির শত্র ‘ তো সেই লেখার কমেন্টগুলো বেশ মজার। কেউ লিখেছে ভারত পিঠ বাঁচানোর জন্যে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে। তারা তো শত্রুই। কেউ এসে রিপ্লেতে তাকে পাকিস্তানি জারজ বলে উল্লেখ করছে। তারপর কিছু গালাগাল করে নিচে কোন এক ভারতীয় বলছে যারা ভারতকে শত্রু বলবে তাদের জন্মপরিচয়ে সমস্যা আছে।
মোটামুটি সব কমেন্টকে আমি এই তিনটে ধাঁচের ভেতর ফেলে বাকী আলাপ করতে পারি। এই যে এত ঘৃণার চাষ চলছে ব্যক্তিজীবনে এরা সবাই হয়ত খুব সাধারণ জীবনযাপন করে। দিন আনে দিন খায় কিংবা ছোটখাটো কোন চাকরি। তারপর বিয়ে সংসার ও বাচ্চা পয়দা করে একদিন মরে যাওয়া। এই ছকবাঁধা জীবনের মধ্যে ও অদ্ভুতভাবে কাজ করছে মিথ্যে অহমিকা। রাষ্ট্রের এই বৈরিতা সাধারণের মগজে এমন ভাবে ঢুকেছে(নাকি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে?) তারা নিজের রাজনৈতিক সীমার বাইরে বাকীদের ‘অপর’ ভাবতে শুরু করে। নিজের ভুখন্ডের বাইরে সবাই মোটামুটি বর্বর, অসভ্য এমন একটা চিন্তাচেতনার বহিপ্রকাশ ঘটায় অনলাইনে অফলাইনে। ফলে সুস্থ স্বাভাবিক যুক্তি ও চিন্তার বাইরে গিয়ে চলে গালাগাল কিংবা ভূয়া গৌরবের যেটা আরো ঘৃণার পথ প্রশস্ত করে দেয়্।
আদতে আমি ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ বলে যা দেখি সব তো কিছু মানুষের খারাপ চিন্তার ফসল। নয়ত পাকিস্তান বলে আদৌ কিছু কি ছিল বা আছে?
ধর্মের ঘৃণার দেয়াল তুলে ভাগ করা হলো উপমহাদেশ। আর উত্তর ভারতের কিছু এলাকাকে কিনা করা হলো পাকিস্তান। আর এদিকে বাংলাকে দুভাগ করে বানানো হলো আরেক পাকিস্তান। আসলেই পাকিস্তান বলে তো কিছু নেই। সেই না থাকার ভেতর উত্থান বাংলাদেশের। পাকিস্তান বৈরিতা না কাটতেই ভারতীয়দের জন্যে দাড়িয়ে গেল দুটা ভিন্ন শত্রুপক্ষ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আর বাংলাদেশের জন্যে ঘৃণা চর্চার জায়গা দাড়ালো ভারত আর পাকিস্তান। অথচ যারা আজ তিনটে জায়গা থেকে এই ঘৃণার চর্চা করছে তাদের দাদা কিংবা তার পূর্বপুরুষ এই ভূমি থেকেই এক হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সমানে লড়েছিল। তাহলে ঘৃণাটা করছি কাকে! নিজেদের তো?
অথচ ইতিহাসের নিরিখে দেখতে গেলে আমাদের ভেতর পরস্পরের আদান প্রদানেই গড়ে উঠেছে এই জনপদ। নানান বহিরাগত শক্তির আক্রমণ আমরা ঠেকিয়েছি কিংবা বিদায় করেছি নিজেদের বোঝাপোড়ার মাধ্যমেই।
এর ভেতর নানান ধর্মের নানান শাসক ছিল যেমন অত্যাচারী তেমন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও ছিল। খারাপ কিংবা অত্যাচারী যাই বলি সেটা এই আধুনিক সময়ে যেমন আছে সেই পূর্বেকার দিনেও ছিল। কিন্তু উপমহাদেশ ভাগ হবার সাথে সাথে দৃষ্টি পড়ল যে কোন ধর্মের অত্যাচারী শাসকের দিকে। সেই শাসকের নিরিখে মাপা হলো তার ধর্মকেও। সেটার ভিত্তিতে করা হলো আরো বিভাজন। যার ফলে এই সময়ে এসেও শোনা যায় এই দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা, ওই দেশে আগুনে পুড়িয়ে মারার মতন ঘটনা।
উপরে উল্লিখিত ভিডিওর মতই হিন্দীতে একটা ভিডিও পেলাম যেটার ক্যাপশন. ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতার এত বছর পরও গরীব কেন’ নানান কারণ দেখিয়ে ভিডিওটা শেষ করা হলো। তো কমেন্টে দেখলাম প্রচুর গালাগাল হয়ে গেল। কারো প্রশ্ন, ভারতও কেন গরীব!
এই ঘৃণাজীবিদের দেখে আগে খারাপ লাগত। এখন খারাপ লাগার দিন ফুরিয়ে গেছে। আমি বরং ইতিহাসের পথ ধরে হেটে যেতে চাই পূর্বের আরাকান থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত কিংবা আরো অনেকটা দূর।
আশা করি আমার প্রস্তুতিপর্বের ভেতরেই পৃথিবী আরো অনেকটা মানবিক হয়ে উঠবে। দেশ নামক মিথ্যে অহমিকা তৈরির যন্ত্রটা ভোঁতা হয়ে সেটা শুধু একটা সিস্টেম হয়ে টিকে থাকবে সব কাজ গুছিয়ে করার জন্যে। কোন ঘৃণা চাষের যন্ত্র হয়ে থাকবে না।
পাকিস্তানকে খুব বেশি জানাশোনার সুযোগ হয়নি সঙ্গত কারণেই।
আপাতত আমার বানারস যেতে ইচ্ছে করছে খুব।

Post a Comment

0 Comments