বাজরাঙ্গি ভাইজান ও আমাদের উপমহাদেশীয় দেশপ্রেম

বাজরাঙ্গি ভাইজান ও আমাদের উপমহাদেশীয় দেশপ্রেম


মুভিটা দেখতে দেখতে লিখাটা তৈরী হয়ে গেছে।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মাত্রাটা বরাবরের মতো পাকিস্তানিদের বেশি। যা তাদের রাজনৈতিক চরিত্রে স্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী ইসলামী জঙ্গিবাদের সাথে এই দেশের নাম ভালভাবেই জড়িত। এই বিশ্বাসের পুরোটাই জানতে পারি না। মিডিয়াতে যতটুকু আসে তাতেই পাকিস্তান আর জঙ্গিবাদকে একত্র করে ফেলি।
যে দেয়াল দাড়িয়ে আছে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানে সেটার মূলে যতটা না ধর্মীয় বিশ্বাস তার চেয়ে বেশি জাতিগত বিদ্বেষ। মায়ের মমত্বের কাছে আর ধর্মের বিচারে এই দেয়াল খুবই ভঙ্গুর। ভালবাসা আর ধর্ম চিরকাল কাঁটাতারে আটকে থাকে না। ভালবাসা সবসময় সতর্ক না। শিশুসুলভ ভালবাসায় অনেক কিছুই হারাতে হয়। কখনো নিজের পরিচয় এমন কি রাষ্ট্রকে হারিয়ে ফেলে না মানুষি জমিনের বাসিন্দা না হতে গন্তব্যহীন ট্টেনে ছুটতে হয়।
অবিশ্বাসের দেয়াল কিছু সময়ের জন্যে আলাদা হয়ে দূরে ঠেলে দেয় ভালবাসাকে। রাষ্ট্রের নিয়ম মাতৃপ্রেম বুঝে না।ভিসা জটিলতায় সন্দেহের দেয়াল এভারেস্ট সমান হয়ে উঠে। দেশ তার নাগরিকের পরিচয় পাসপোর্ট ছাড়া স্বীকার করে না। মানুষের পরিচয়ের চেয়ে ওই কাগজের পাসপোর্টের শক্তি যুগে যুগে রাষ্ট্রের আইন কঠোর করেছে আর কাঁটাতারের বেড়ায় অবিশ্বাসকে সর্বোচ্চ স্থানে পৌছে দিয়েছে। সবাই দেয়ালকে বড় করে দেখেনা।
খাবারের ভাষায় দেশ,কাল ও জাতিভেদে পার্থক্য নেই। তাই এই ভাষা কাছে টানে। মানুষ ধর্মের আশ্রয়ে বাঁচতে চায় আর অন্যকেও ধর্মের আশ্রয়ে তুলে দিতে চায়। রাষ্ট্রহীনদের পার্থক্য হারায় নানা ধর্মের উপাসনালয়ে। শুধু এই এক জায়গায় আশ্রয়ে থাকলে মানুষ ধর্মের পর্দাটা সরিয়ে নিজেকে কিছুটা নিরাপদ ভাবে। ধর্ম আর বর্ণ পরিচয়হীন মানুষের প্রতি যে ভালবাসা সেটাই প্রকৃত ভালবাসা। রাষ্টের কর্তার কাছে সব নাগরিক সমান গুরুত্বের না।
রাষ্ট্র তার অজান্তেই অনেক নাগরিকের আশ্রয়দাতা হয়ে উঠে। সে মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। মানুষ ধর্ম বা জাতিগত চিহ্নের উর্দ্ধে থাকলেই রাষ্ট্র বা নাগরিক অন্য ধর্ম বা বর্ণের কাউকে মানুষ বলে বিবেচনা করে। আর এই পরিচয়ের বৃত্ত ভাঙতেই সমাজের চিরাচারিত রুপ ফুটে উঠে। তখন রাষ্ট্র নিজের ভেতরে আটকে পড়ে। অন্য জাতি আর অন্য ধর্মের প্রতি যে হীনতর চিন্তাধারা সেটা মুখোশ খুলে স্পষ্ট হয়ে উঠে। রাষ্ট্রের চরিত্রই এই সে চিরস্থায়ী মুখোশ ধারণ করতে পারে না। সব কিছু যতো দ্রুত বদলায় রাষ্ট্র তার সাথে তাল মেলাতে না পারলেও যুগে যুগে নতুন নতুন মুখোশ রাষ্ট্রকে আঁকড়ে ধরে কখনো কোন আদর্শ অথবা কোন ধর্মের ভিত্তিতে।
যে রাষ্ট্রে জন্ম তার দায়টুকু অস্বীকারের উপায় কার আছে? স্বভাবজাতভাবে জন্মস্থানের প্রতি প্রেম সব বয়সভেদে একই থাকে। দেশ থেকে কি মানুষ আলাদা? দেশের কর্মের দায় কতটুকু নাগরিকের? কোন ভূখন্ডে জন্মালেই সে ভূখন্ডের প্রতীক হয়ে উঠে? মানুষের শরীরে কোন দেশের পতাকা থাকে না। তবু রাষ্ট্রের পরিচয়ে নাগরিককে আলাদা করা যেনই নিয়ম।এই নিয়মের ফাঁদে আত্মপরিচয়হীন মানুষ আবার আশ্রয় হারায়।
খাবারের মতো ব্যবসায়িক বোধের জায়গায় ধর্ম আর জাতিভেদের মূল্য থাকেনা। এখানে মানুষ শুধুই পণ্য। যে পণ্য দেশে দেশে মুনাফা বিকোয় আর রাষ্ট্র গর্বের অহমিকার প্রদীপ জ্বালায় বিনা পাসপোর্টের নাগরিকের সৌজন্যে। এটা কি রাষ্ট্রের স্ববিরোধিতা নয়? সীমান্তে
৪৪০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইন স্বগর্বে দাড়িয়ে থাকে রক্তের নেশায়। যে নেশায় কত সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। আর জনগণের টাকায় সীমান্ত প্রহরীর নেশা যেন বিদ্যুতের প্রবাহের চেয়েও বেশি। গুলি ছোঁড়ার আত্মগরিমায় মানুষ পরিচয়টা তুচ্ছ হয়ে পড়ে। অন্ধকার ও নাগরিকত্ব কে আড়াল করতে পারে না। রক্তের নেশায় উন্মত্ব বাহিনীর কাছে সততার প্রশ্ন বড্ড বেমানান।
রাষ্ট্রীয় অবিশ্বাসের চূডান্ত উন্মত্ত্বতায় মেতে উঠে দেশপ্রেমিক সৈনিক। এই দেয়াল ভাঙে না।শুধু সিনামাতেই দেখা যায় রাষ্ট্রহীন নাগরিকের আবেগের মূল্য দিতে। জীবন সিনেমা না।বাস্তবতার নিরিখে এক একটা সৈনিক দাড়িয়ে থাকে রক্তের নেশায়। সীমান্ত রাষ্ট্রের মতোই অন্ধ বিশ্বাসী। যারা শুধু মানুষকে বিচার করতে শেখে ধর্মীয় চিহ্ন দ্বারা।
নিরাপত্তা সবার ই দরকার আর রাষ্ট্র সব সময় তার শত্রু খুঁজতে থাকে। এই শত্রু শুধু শত্রুতার জন্যে শত্রুতা না। অন্যের প্রতি যে বিদ্বেষ সেটা ভালবাসতে শেখায় না শুধু সন্দেহ করতে শেখায়। যে সন্দেহ সাংবাদিকতার নৈতিকতার ভিত্তিকেও মাঝে মাঝে নড়বড়ে করে দেয়। জাতিগত চেতনার যে আবেদন সেটা সবাইকে ছুঁয়ে যাবেই না বা কেন? রাষ্ট্রের চরিত্রে নাগরিককে বিচার করার যে মানসিকতা সেটা সব সময় সত্যি না। অনেকেই থাকে যারা অসাম্প্রদায়িকতা,পুঁজিবাদ,সমাজতন্ত্র,মৌলবাদ আর জাতীয়তার জ্ঞান রাখে না। তাদের মানবিক বোধ মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখায়। মানুষ তো মানুষ তবুও আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় আমরা সত্যিই মানুষ।
মানুষ কে মানুষ ভাবতে উচ্চমার্গীয় জ্ঞান রাখতে হয়না বয়ং আত্মার উপলদ্ধিই পারে দুই দেশের মানুষকে কাছে টানতে। রাষ্ট্রের দূর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর পৈত্রৃক সনদ নিয়ে থাকলেও রাষ্ট্রহীনদের পরিচয় ঢাকা পড়ে মুখোশের আড়ালে। আর নিরাপত্তার চাদরের যে ফাঁক থাকে সে ফাঁক গলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দেয়াল দুর্বল হয়ে পড়ে।যুগে যুগে রাষ্ট্র যতো নিরাপত্তার দেয়াল গড়েছে সময়ের সাথে সাথে সেই দেয়াল চূর্ণ হয়েছে ধূলোয়। রাষ্ট্রের যতো ভালবাসা তার দৃশ্যমান নাগরিকের জন্যেই। পাসপোর্টহীন নাগরিকের জন্য না আছে মিডিয়ার সহানুভতি না আইনের আশ্রয়। এই প্রবঞ্চণা কার সাথে? রাষ্ট্রের দায় এত সংকীর্ণতায় ভরা হলে তার নাগরিকের কর্তব্য ও আচরণের বোধ কতটা শক্ত সেটা অনুমেয়।
রাষ্ট্র সর্বদা ভীত থাকে কখন সে মিথ্যা অহমিকা হারিয়ে ফেলে। এই ভয়ে রাষ্ট্র মিথ্যা আর সত্যের পার্থক্য ভুলে চরম পৈশাচিকতায় মেতে উঠে। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আবেগের জায়গা শুধু তার নিজের স্বার্থে।অন্যদিকে দুর্বলের পক্ষে তার রাষ্ট্রশক্তির সাময়িক ভালবাসা জেগে উঠে।তবে এই আবেগ ও স্বার্থকে বিসর্জন দিতে পারে না।
দুই রাষ্ট্রের দেয়াল ভাঙতে যেটা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সেটা মানবপ্রেম। মানুষের প্রতি ভালবাসার কোন দেশ নেই। কোন সীমান্ত বা কাঁটাতারের বেড়ায় ভালবাসাকে বেধে রাখার দুঃসাহস কার আছে? এই স্বার্থহীন ভালবাসায় কাঁটাতারের মাঝখানে ভালবাসার মশাল জ্বালায় চিরকাল।


Post a Comment

0 Comments