শৈশবের বৈশাখ

শৈশবের বৈশাখ

সে সময় বৈশাখ আসছে মানে জানতাম কদিন পরই প্রচন্ড ঝড় আসবে। হতোও তাই। বিলে তখন যাওয়া বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তীব্র রোদের কারণে ঘরের বাইরে পা দেয়াই কঠিন।
বাবার দোকানে বাংলা বছরের শেষ হলে একটা চিঠি আসতো। লেনদেন বাকী থাকলে সেগুলো দিতে হবে। নবর্ষের দিন প্রত্যেকটা দোকানে মিষ্টি খাওয়ানো হতো। এটাকেই হালখাতা বলতো মনে হয়। এখন অবশ্য হালখাতার কথা আর শুনি না।
ছোটদের অপেক্ষা ছিল বৈশাখী মেলার জন্যে। অবশ্য সেটা যে বৈশাখী মেলা ছিল তখন জানতাম না। সেদিন আমরা স্কুলে যেতাম কিনা মনে নেই। তবে এই মেলার জন্যে তিন চার দিন আগে থেকেই অস্থির হয়ে যেতাম। ঘরের লোকজনকে জ্বালিয়ে মারতাম মেলায় যেতে দিতে। গ্রামের সব বাড়ির ছেলে-বুড়ো সবাই নতুন জামা কাপড় পরে বিলের পথ ধরে ঠা ঠা রোদের মধ্যে হেটে বেঁড়িবাধের পাশ ঘেঁষা জেলে পাড়াতে যেতাম। বেড়িবাঁধের ওই পাড়ে ছিল সমুদ্র। মাছ ধরার ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো শব্দ করে ছুটতো। সেই আমি প্রথম সমুদ্রের মায়ায় পড়ি। কেওড়া গাছের বাগানের শেষে নৌকা বাঁধা থাকতে দেখে ছুটতে ইচ্ছে করতো।
দিনভর বিলের পথ ধরে লোকজনের আসা যাওয়া হতো। এখন ভাবতে অবাক লাগে সে সময় বাড়ির বউ-ঝিরা মিলি কয়েক কিলোমিটার হেটে মেলায় গেলেও কোনো সমস্যা হয়নি। মেলায়ও কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।

খালের ধারে তখন মেলা বসতো। শহর থেকে কুমোরদের তৈরি পোড়ামাটির তৈরী ব্যাংক, খেলনাসহ (ঘোড়া, হাতি) বিচিত্র জিনিস তুলতো মেলায়। এছাড়াও বাঁশ ও বেতের তৈরী নানান খেলনা আনা হতো। বৈশাখের পরের কদিন মেলা থেকে আনা খেলনা নিয়েই দিন কাটতো আমাদের। মেলায় থাকতো গৃহস্থালী জিনিসপত্র। মেয়েদের কাঁচের চুড়ির দোকনে ভীড় হতো বেশি।
আমার সাথে যেতেন দাদী। বাবার থেকে টাকা নেয়া থাকতো। দাদী ঘরের জন্যে বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনতেন। কুলা, চালুনি, মাটির ব্যাংক তো নিতেনই বাড়ির ছোটদের জন্যে ‘চনামনার ঠ্যাং’ নিতেন। এই খাবারটা খুব ভাল পেতাম। এগুলো ছাড়াও মুড়ি, জিলাপি, ফুটখৈ, বিন্নি ধানের খৈ, বুট, বাদাম, মুরুলি, বাতাসা, গুড় বিক্রি হতো।
নাগর দোলা ও পুতুল নাচ নিয়ে মেতে থাকতো শিশুরা। মেলার পশ্চিম অংশে নানা ধরনের খেলা হতো। কলসির মধ্যে গ্লাস রেখে অনেক দূরত্ব থেকে সেই গ্লাসে কয়েন ফেলার খেলা হতো। খালের পাড় তখন কানায় কানায় পূর্ণ। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতো এই মেলা।
এই দিন মেলায় যাওয়ার আগে সকালে বাড়ির বড় পুকুরে জাল দেওয়া দেখে যেতাম। বাড়িওয়ালাদের ঘরে সব মাছ জমা রাখা হতো। তারপর প্রত্যেক ঘরে ভাগ করে দেয়া। বৈশাখের প্রথম দিন বলে মাছ খাওয়া বলা যাবে না। বিশেষ দিন ভালমন্দ কিছু খেতে হবে তাই জাল দেওয়া। যেমনটা দিতে দেখি শবে বরাত সহ অন্য উৎসবের সময় দিতে।
মেলায় যাওয়ার আগে পান্তা খেয়ে যেতাম। পান্তা আমরা নিয়মিতই খেতাম। রাতে ভাত থেকে গেলে মা সকালে পানি দিয়ে খেতে দিতেন। বৈশাখের জন্যে আলাদা করে পান্তা খেতে হবে জানতাম না।
এই মেলায় হিন্দু-মুসলিমের ব্যাপার ছিল না। মেলাটা হতো হিন্দুপাড়াতে। বিক্রেতোদের বেশিরভাগও হিন্দু ছিল। মন্দিরে হিন্দুদের প্রার্থনাও চলতো। পাশেই চলতো মেলা।
বাড়ির পাশেই একটা হিন্দু বাড়ি ছিল। সেখানে বৈশাখ আসলে ঢেঁকির ব্যবহার বাড়তো। দাদী সেখান থেকে খৈ ভাজা, মুড়ি ভাজা নিয়ে আসতো। বছরজুড়ে তাদের সব উৎসব পার্বণে খাবার পাঠিয়ে দিত। আমরা দাওয়াত পেতাম।

Post a Comment

0 Comments