কার্পাস মহলের যুদ্ধক্ষেত্রে

শুক্রবার বান্দরবান অথবা রাঙামাটি যাব ভেবে রেখেছি। আগেরদিন রাব্বি বলল কাপ্তাই যাওয়ার জন্যে। কদিন আগেই কাপ্তাই গেছি। চেনাপথ বলে অত তাড়াহুড়ো ছিল না। সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে বের হলাম।
চা খেয়ে মুরাদপুর হয়ে চললাম অক্সিজেনের দিকে। অক্সিজেনের রাস্তাটা একদম ফাঁকা। মোড়ে পৌছে ছবি তুলে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক ধরে চললাম কাপ্তাই রোডের দিকে। রাস্তা কিছুটা ভাঙা হলেও ভোর বেলায় এ রাস্তায় চালাতে ভাল লাগছিল। কুয়াইশ সড়কে পৌছতে চারদিকে পুরোপুরি আলো হয়ে গেছে।
হাটহাজারীরর দক্ষিণ প্রান্তে এই জায়গার নাম বুড়িশ্চর। বুড়িশ্চরের দিকটায় সবুজ কম। রাস্তার দু’পাশে বাড়ি ঘর বাদে কিছু চোখে পড়েনি। দশ কিলোমিটার মত যাওয়ার পর পৌছলাম মদুনাঘাট ব্রিজে। হালদা নদীর কথা পত্রিকা পড়ে জেনেছি কতবার। এবারও ঘুরে দেখার সুযোগ হলো না। এই ব্রিজ পেরোনোর পর রাস্তা বেঁকে চলল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। এদিকে মিশুর সাইকেলের হাওয়া কমে গেছে। কোথাও লিক আছে। ধীরে চালিয়ে রাউজানে চলে এলাম। মাস্টারদার নোয়াপাড়া গ্রাম ছাড়িয়ে থামতে হলো পথের হাট এসে।

সাইকেল মিস্ত্রির দোকান খুঁজতে লাগলাম। ভেতরের দিকে একটা দোকানের খোঁজ পেলাম। মিস্ত্রি ভেতরে শুয়ে। অনেক ডাকাডাকির পরও উঠতে রাজি হলেন না। এই অসহযোগীতাকে ‘বাংলাদেশী চরিত্র’ ধরে নিয়ে গালাগাল দিলাম কিছু। তারপর শুরু হলো বৃষ্টি। ওই বৃষ্টিতেই ঘন্টাখানেক আটকে ছিলাম। পথের হাট বাজারের শেষ দিকে এক মিস্ত্রি ঘুমোতে যাওয়ার জন্যে দরজা বন্ধ করছিলো। তাকে অনেক অনুরোধ করে রাজি করালাম।
লিক সারিয়ে কালু মিয়ার টেক, মাতব্বরের টেকের পর গশ্চি ধরের টেকে এসে আবার ছবি নিলাম। রাস্তা কিছুদূর যাওয়ার পরপরই কর্ণফুলী থেকে খাল ঢুকে গেছে। তাই ছোটখাটো ব্রিজ পথে থাকেই। এরপর অনেকটা পথ দু’পাশে সবুজের মধ্যে চালিয়ে পালিয়ে চুয়েটে(চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) পৌছলাম। এরপর রাস্তা খানিকটা উঁচু নিচু। পাহাড়ের দেখাও পেলাম। এখানেই শুরু রাঙ্গুনিয়া উপজেলা।
রাস্তা ঢালু হওয়ার কারণে রাঙ্গুনিয়া ধরে যেতে চাপ নিতে হয়নি। এর মধ্যে একটা জায়গার নাম ছিল পোমড়া বুড়ির বাজার।
বেশ কয়েকটা বাজার পার হওয়ার পর ম্যাপ খুলে দেখি ফকিরখিল থেকে কর্ণফুলী আবার ডানে ঢুকে গেছে। আরো সামনে একটা ব্রিজ। ওই পাড়ে সরফভাটা। এরপর রাস্তা কর্ণফুলী ছাড়িয়ে চলে গেছে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার দিকে।
এর আগে দুই কিলোমিটার মত একটা রাস্তা পেরোলাম।। ডান পাশে বিশাল বিল। বিলের উত্তর পশ্চিমে পাহাড়। রোদের বিপরীতে হওয়ায় পাহাড় স্পষ্ট দেখাও যায় না। পাহাড়ের নিচে কিছু পাকা বাড়ি। দূর থেকে জায়গাটা দেখতে দার্জিলিংয়ের মত লাগে।
বিলের মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা চলে গেছে। দুই একটা ইট বিছানো রাস্তাও আছে। কোনটার দু’পাশে গাছ লাগানো। কোনটাতে গাছ নেই। এই পথের শেষ দেখাও যায় না। দুই একজন করে হেটে যাচ্ছে। দুই পাশে ধানক্ষেত। আর সামনে পাহাড়। ধান মাড়িয়ে নাড়া রাখা হয়েছে একটা পথে। মিশুকে থামতে বলে ছবি নিলাম।
তারপর মিনিট দশেক চালিয়ে গেছি পৌরসভা। এরপর ইছামতী নদী। খালের দক্ষিণ পাড়ের জায়গার নাম ঘাটচেক। তারপর বড় একটা বাজার। সেটা রোয়াজারহাট। এরপর বিলের মাঝখান দিয় দীর্ঘ পথ পেরোনোর পর চন্দ্রঘোনা বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হলো পাহাড়ী এলাকা। এর আগেই বেশ কিছুটা পথ কর্ণফুলী নদীকে আঁকাবাঁকা চলন দেখা গেছে। লিচুবাগান থেকে রাস্তার বাঁক বদলে গেল দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। একটা রাস্তা চলে গেছে উত্তরে বান্দরবানের দিকে। কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই বান্দরবান জেলা।
আমরা কাপ্তাইয়ের দিকে চললাম। পুরো রাস্তাই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে। মাঝখানে কিছু আদিবাসী ঘর বাড়ি চোখে পড়েছে। তারপর বিজিবি ক্যাম্প ও চা বাগান ছাড়িয়ে গেছি বড়াইছড়ি। এর আগেই রাব্বি বলেছে বড়াইছড়ি-রাঙামাটি সড়কে বন্ধু চনু মং এর বাড়িতে যাবে। বড়াইছড়ি বাজার ফাঁকা। বামে ঢুকতেই পরল বড় এক টিলা। এরপর মিনিট বিশেক পথ চালাতে সুবিধে হলো। পুরোটাই ডাউনহিল। কিছুদূর পর পর বেশ কিছু বাঙালি গ্রাম। রাস্তা যত ভেতরে ঢুকেছে পাহাড় আকারে তত বড়। কোথাও কোথাও সমতল জায়গা। আদিবাসীরা কাজকর্ম করছে।
এর মধ্যেই শুরু হলো বৃষ্টি। সাইকেল রাস্তার উপর রেখে মাছার উপর বসে পাহাড়ে বৃষ্টি দেখছিলাম নতুন করে। কজন আদিবাসী ছেলে পাহাড় থেকে গাছ নিয়ে নেমে এসে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। হাতে দা। অনভ্যস্ততার কারণেই ভয় করছিল। পরে বৃষ্টিতে ভিজেই চললাম ঘাগড়া বিজেপি ক্যাম্পের দিকে। পথে আবার থামতে হলো বৃষ্টির জন্যে। এরপর পথও উঁচু।
ঘাগড়া বাজারে সাত কিলোমিটর আগেই চনু মংয়ের বাসা। ওর মা ভুট্টো করে দিল। গাছের আম কেটে দিল। ওর ঘরে ছবি বাঁধানো দেখলাম দুলাভাইয়ের। বিজিবিতে চাকরি করে। ওর দিদির বিয়ের ছবির উপরে লেখা ‘শুভ বিবাহ’। সবই চোখে লাগল। বাঙালি কায়দায় সেমি পাকা ঘর করেছে। ওর মাও কথা বলছে পুরোপুরি বাংলায়। বাঙালির দেশের প্রভাব পড়েছে এই পাহাড়ী জীবনেও।
মং জানালো ওর কাগজপত্র ছাড়া সাইকেল নিয়ে বাজারের দিকে গেলে সার্জেন্ট আটকায়। ৫/৭শ নিয়ে ছেড়ে দেয়। বাঙালির উপর রাগ নাকি পুলিশের উপর বুঝতে পারিনি। ওর ওখানে খাওয়া শেষ করে ঘাগড়া বাজারের দিকে চললাম।
বিশাল সব টিলার নিচে সমতল জায়গাতে আদিবাসী গ্রাম। তখন আবার তুমুল বৃষ্টি। এর মধ্যে মিশুর সাইকেলের চাকা আবার লিক হয়েছে। সেটা সারাতে হেটেই নিয়ে গেছে ঘাগড়া বাজার।
ঘাগড়া মোড়ে আর্মি দুজনকে দেখলাম। কাগজপত্র চেক সহ বড় গাড়িগুলো দেখছে। ওখানেই সারাতে হবে সাইকেল। হাওয়া যে দেবে সে গেছে মসজিদে। তার বাড়িতে গিয়ে পেলাম না। পরে নিজেরাই হাওয়া দিয়ে সাইকেল সারিয়ে চললাম রাঙামাটির দিকে।
এত পথ যেতে মিশু রাজি ছিল না। জোর করতে হলো। ঘাগড়ার শুরুতেই আর্মির ক্যান্টনমেন্ট। ওটা স্থায়ী কিনা জানি না। এরপর দেড় থেকে দুই কিলোমিটার উঁচু পথ। ওখানেই শুয়ে পড়েছি তিনজন।
তারপর অনেকটা পথ হাটিয়ে নিতে হলো। অত খাড়া রাস্তা চালানো সম্ভব ছিল না। একটা বাজার ছাড়িয়ে যেতেই খাড়া সব পাহাড় থেকে নামতে হলো নিচের দিকে। গত বছর পাহাড় ধসে পরেছিল একটা ব্রিজ। সেখানে অস্থায়ী ব্রিজ করা হয়েছে। তার উপরে পাহাড় চূড়ায় বৌদ্ধদের স্থাপনা আছে। ওখান থেকে আবারো খাড়া পথে নেমে পৌছলাম মানিকছড়ি বাজারে। এখানেও আবার আর্মি ক্যাম্প। মানিকছড়ি বাজার থেকে উপরে উঠার রাস্তাটা সবচেয়ে উঁচু। হেটে যেতে হলো রাঙামাটি টিভি স্টেশন অবধি। গেটে দেখলাম এক পুলিশ সদস্য ফেসবুকে কিছু একটা দেখে হাসছে। ছবির জন্যে দাড়াতেই ধমকে উঠল। ছবি তুলবা না। যাও যাও। ফের মনোযোগ দিল ছবিতে। একজন বাংলাদেশী পুলিশ যেমন ব্যবহার করার কথা তাই করেছে দেখে ভীষণ আনন্দ হলো।
এর আগে একটা দোকানে চা খেতে গিয়ে ঠান্ডা পানি চাইলাম। ফ্রিজে রাখা এমিন পানি খেতে দিলেন। টাকা দিলেন না। এই বৃদ্ধ অবাংলাদেশী টাইপ লোকটা বাংলাদেশে থাকে দেখে অবাক হলাম।
ওখানে খেয়ে গেছি ভেদভেদী। শহরের শুরু। ভেদভেদীর পর রাঙামাটি উপজেলা ভবনের সামনে গিয়ে আবার ছবি নিলাম। বন্ধু আসিফকে জানালাম রাঙামাটি এসছি। বনরুপা যেতে বলল আবার জানালো রিজার্ভ বাজার যেতে। এর মধ্যেই রাঙামাটি শহরটা দেখলাম। সরকারী বিভিন্ন দফতর সহ সংস্কৃতি চর্চার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চোখে পড়ল। জেলা সদরটা বেশ সমৃদ্ধ মনে হলো। অন্তত পাহাড় হিসেব তাই মনে হবে।
এখানে আদিবাসীদের দোকানপাট বা কোন ঘর বাড়ি চোখে পড়েনি। তাড়াহুড়ো ছিলাম বলেই হয়ত। উত্তরবঙ্গের লোকজন বেশি মনে হলো। নদীভাঙ্গা লোকজন এখানে আশ্রয় নিয়েছে জানতাম।
পুরাতন বাস স্ট্যান্ডের আগে দুই লেকের মাঝখানে রাস্তাটায় দাড়ালাম। উত্তর দিকের লেকে বড় বড় বোট। এসবে ভেতরের উপজেলা থেকে মালামাল আনা হয়। পানি একদম কমে যাওয়াতে বোট চলতে পারে মনে হলো না।
রিজার্ভ বাজার পৌছানার পর তুমুল বৃষ্টি। পেছনে কাপ্তাই লেক। বৃষ্টির মধ্যেই দেখতে গেলাম। কুয়াশার মত আবছা ছবি বাদে কিছুই দেখা গেল না। এর ওপাড়েই মিজেরাম রাজ্য।
ধারণা করতে চেষ্টা করলাম মিজোরাম কেমন। মিজোমার হয়ত রাঙামাটির মতনই পার্বত্য জেলা। মানুষগুলোও দেখতে একই হওয়ার কথা। ফারাক কিসে? ওদের জাতির পিতা আর আমাদের আলাদা। ব্যস দেশও আলাদা। তাই সীমান্ত দেগে দেয়া হয়েছে। পূর্বে মিজোরাম ছাড়াও আছে মায়ানমারের চিন প্রদেশের সীমান্ত। উত্তরে পরেছে ত্রিপুরা রাজ্য।
উইকিপিডিয়া বলছে, জেলা হওয়ার আগে এই এলাকার নাম ছিল কার্পাস মহল। কার্পাস মহলের দখল নিয়ে চাকমা, ত্রিপুরা, মুঘল ও আরাকানের রাজাদের যুদ্ধ হতো। এক সময় এই এলাকা দখল করেন চাকমা রাজা বিজয়গিরি। পরে ১৬৬৬ সালের দিকে মুঘলরা এই এলাকায় আক্রমণ করে পরাজিত হয়।
ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখলের কয়েক বছরের(১৭৬০-৬১) মাথায় এই এলাকায় উপস্থিত হয়। এরপর স্বাধীনতা এলো পাহাড়েও। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাধীনতার কি হাল জানি না। আশির দশকে নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা থেকে এখন বাঙালি ঢোকানো হয়েছে। যাদের নাম দেয়া হয়েছে সেটেলার।
সেই বাঙালিরা ছাড়াও এখানে আছে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, চাক, মুরং, ত্রিপুরা, খেয়াং, খুমি, লুসাই, ম্রো, পাংখোয়া, সাঁওতাল, মণিপুরী সহ ১৪টি ক্ষুদ্র জাতির লোকজন।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে তখন। শহরে ফিরে অফিস ধরতে হবে। বাসের ছাদে তুলতে হলো সাইকেল। রাব্বি আর মিশু ঘুমে ঢুলোঢুলো। বৃষ্টির কারণে বাসের জানালা খোলাও কঠিন।
পাহাড়ে বৃষ্টির শব্দ কানে আসছিল। ঘুমও আসল বৃষ্টি পেয়ে। চোখ খোলার পর দেখি রাউজান পৌরসভা। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে শহরে আসার আগে দেখি পুরো ভাড়া আমাদের কাছে নেই।
এক বন্ধুকে মুরাদপুর অপেক্ষা করতে বললেও সে জানালো টাকা নেই। বৃষ্টির তখন তুমুল বেগ। ফ্লাইওভারের নিচে তিনটা সাইকেল নামিয়ে দিল। রাব্বি গেছে টাকা বিকাশে নিতে। পরে টাকা দিয়ে বাসকে বিদায় করে মুরাদপুরে চা খেতে খেতে অপেক্ষা করে আরো সময় গেল। বৃষ্টি ফুরোনোর পর ওদের বিদায় দিয়ে জিইসির দিকে যাব।
একটু যেতেই হাটু পানি। ভিজলাম অর্ধেক। স্টেশনের সামনের গ্যাপে পানির তুমুল স্রোতে মানুষ পার হওয়াই কঠিন। সেখানে অপেক্ষা করতেই গেল এক ঘণ্টা। তারপর গেছি বাসায়।

Post a Comment

0 Comments