মেঘ পাহাড়ের বাংলাদেশ

সকাল নয়টার পরেই টিটু ডাকতে শুরু করলো। জোরাজুরিতে উঠতেই হলো। বলল কাপ্তাই যাবে। নয়টা হলেও সেভাবে রোদ উঠেনি। আমাানবাজারের ভেতর দিয়ে কাপ্তাই রোডে উঠলাম।
রাস্তা তুলনামূলক ফাঁঁকা পেলাম। সিএনজি অটোরিকশার জন্যে গতি কমাতে হচ্ছিল দেখে একটু বিরক্তি ছাড়া বিশেষ কোন সমস্যা হয়নি। রাঙ্গুনিয়া পৌঁঁছে নাস্তা করে চলে গেলাম লিচুবাগান পর্যন্ত। এর আগে শুনেছি লিচুবাগান হয়ে বান্দরবান যাওয়া যায়। টিটুকে সেকথাটাই জানালাম। টিটু কিছুটা কনফিউজড। আমিও। ঠিক হলো বান্দরবানের দিকেই যাব।
লিচুবাগান পরেছে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায়। আর নদীর ওপাড়ে কাপ্তাইয়ের রাইখালী। মাঝখানে পরেছে কর্ণফুলী নদী। ছোট একটা ফেরীই যোগাযোগের একমাত্র উপায়। ছোট কিছু নৌকাও আছে। এই ফেরী চন্দ্রঘোনা, রাজস্থলী, কাপ্তাই, রাঙ্গুনিয়া, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির মধ্যে যোগযোগ ধরে রেখেছে।

ফেরী পার হতে হতে চারদিক কালো হয়ে গেল। দূরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। রাইখালী হয়ে চললাম রাজস্থলী উপজেলায়। কিছুদূর সমতল এলাকা তো আবার কিছুদূর পাহাড়। এ পথে রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়ে হয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর একটা আর্মি ক্যাম্প পেলাম। সৈনিক ইশাারায় দাড়াতে বলল।
জানতে চাইলো, বাইকের হেডলাইট জ্বলছে কেন? জানালাম, নতুন সিরিজের গাড়ি গুলোতে এমন। পাশে থাকা পুলিশের ড্রেসে লোকটা বলল, এসব আমারে শেখান? কেমনে লাইট বন্ধ করতে হয় আমার জানা আছে। ওইদিন একটা আসছে। দুই মিনিটে লাইট বন্ধ করে দিছি।
পরের সার্ভিসিংয়ে করিয়ে নেব বলার পরও পুলিশের ড্রেসে থাকা লোকটা এখনই লাইট ভেঙ্গে ঠিক করে দেবে এসব বলা বন্ধ করছিল না। সৈনিক জানালো পরেরবার এ পথে আসলে লাইটটা বন্ধ করে আসতাম।
এসব ভাবতে ভাবতে দুুই মিনিট যেতেই সামনে পরলো ট্রাক। ব্রেক কষতেই বালিতে স্লিপ করে চলে গেলাম দুই তিন ফুট সামনে। হাতে পায়ে লাগলো দুজনেরই। বাইকেরও কিছুটা এদিক ওদিক হলো। ট্রাকের লোকজন এসে তুলল।
ক্ষত নিয়েই ছুটলাম বান্দরবানের দিকে। বালাঘাটা পৌঁছে ফার্মেসী থেকে ওষুধ নিলাম। এবার বাড়ি ফিরে যাওয়া বোকামি মনে হলো। ঠিক হলো যাব নীলগিরি। সদর থেকে নীলগির যাবার পথের শুরু থেকেই খাড়া খাড়া পাহাড়। নীলগিরির অনেক অাগেই মেঘের দেখা পেলাম।

পাহাড় ঢালু হলে মেঘ উধাও হচ্ছে আবার উঁচু উঠলে মেঘ। কখনোবা রোদ এসে পরছে গায়ে। হঠাত করেই বৃষ্টি শুরু হচ্ছে।
পথে অসুবিধাা বলতে মোড়গুলোতে বোঝা যাচ্ছিল না সামনে থেকে কোন গাড়ি আসে কিনা। আর উঁচু পথ হলে মাঝখানে গিয়ে বাইক থেমে যাচ্ছিল। এসবের মধ্যে লোকজন বলতে দুই চার জন মারমা কাজ করে ফিরছে। বিশালাকার সব পাহাড় পেরোতে পেরোতে চারটা হয়ে গেছিল নীলগিরি পৌঁঁছতে। তারপর যাত্রা থানচি সদরের দিকে।
এই রোডের শেষের দিকটা আরো ভয়ানক। দূরের পাহাড় ছাড়া কিছুই আর নেই। সন্ধ্যাা নেমে গেছে তখন। বলি পাড়া পৌঁছতে অন্ধকাার। বিজিবি নাম, দস্থখত নিয়ে ছেড়ে দিল। এবার ঘন জঙ্গলের মত একটা পথ দেড় ঘন্টা চলতে হলো অন্ধকারে। পুরো পথে পরেছে মাত্র দুটো জিপ পরেছে। আর তিনটা বাইক। ভয় তো ছিলই সেটা বেড়েছে উঁচু রাস্তায় বাইক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। সবশেষে সন্ধ্যা সাতটায় পৌঁছলাম থানচি বাজার।

থানচি আসার আগে শুনেছি দুই তিন হাজার টাকা হোটেল ভাড়া লাগবে। এদিকে আমারদের এত টাকাও নেই। বাজারের ভেতর খেয়ে নিয়ে ব্রিজের পূর্ব পাশে হোটেল পেলাম । চারশ টাকাতেই থাকা যাবে। বাইকও রাখা যাবে।
মারমা ম্যানেজারের হৃদয় খুব সদয় পেলাম। ফোনের চার্জার তো দিল। সাথে দিল লুঙ্গি। রাত একটার দিকে ক্ষিধে লেগেছে দরজা খুলতে বলায় নিজের জন্যে রান্না করা ভাতও খেতে দিল।
পরদিন সকাল সকাল ঘুম ভাঙল। টিটু উঠার অপেক্ষা করতে করতে নয়টা হয়ে গেল। এবার যাব থানচি থেকে আলীকদমে। এ পথের শুরুর দশ মিনিট চালানোর পরই উঁচু একটা রাস্তা পড়ল। ওটা পেরোতেই দ্বিতীয় দফা বাইক নিয়ে পরে গেলাম। উঁঁচু রাস্তার মাঝখানে বাইক পৌঁছলেই থেমে পেছনের দিকে চলে যাচ্ছিল। বাইক ধরে রাখাই কঠিন হয়ে গেল।
টেনে হিঁচড়ে এভাবে কিছুদূর যাওয়ার পর উঁচু রাস্তায় চলা শিখে গেলাম। তারপর ডিম পাহাড়ের আগে করে আবার সেনারা থামাল। ডিম পাহাড় আমরা চিনতাম না। রাস্তা বেশি উঁচু দেখে কিভাবে পার হবো বুঝতে পারছিলাম না। বাইক মাঝপথে আটকে গেলে টিটুকে আবার হেটে হেটে উঠতে হবে। এক বাইকারকে দাড় করলাম সে জানালো এটাই ডিম পাহাড়।
কিছুক্ষণ পর পর মেঘ এসে পুরো পাহাড়কে ডেকে দিচ্ছিল। আবার মেঘ উধাও হলে পাহাড়ের অর্ধেকটা চোখে পড়ে। উইকিপিডিয়া বলছে, এই পাহাড় থানচি ও আলীকদম জেলার মাঝামাঝিতে পড়েছে। এ পাহাড়ে নির্মিত রাস্তাটি সমুদ্র সমতল থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে।
আমাদের মাথায় ছিল পথ তো মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। কিন্তু উঁচু নিচু পাহাড়ের এই পথে ৩৩ কিলোমিটার পথই হয়ে গেল ১০০ কিলোমিটারের বেশি। সময় লেগে গেল অনেক।

ডিম পাহাড়ের অনেকক্ষণ ধরে রাস্তা নামল নিচের দিকে। এরপর অনেকটা পথ কোন জনপদ ছাড়া এগোলাম। আলীকদম পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল।
আলীকদম অনেকটা সমতল এলাকা। সবখানে বাঙালির বাস। আলীকদম থেকে লামা আসার পর আবার উঁচু রাস্তা। পায়ে ব্যাাথা তখন বেড়ে গেল। লামার পাহাড় ছাড়িয়ে আসতেই পেলাম চকরিয়া-কক্সবাজার হাইওয়ে। তখনই শুরু তুমুল বৃষ্টি। পটিয়া পর্যন্ত ভিজতে ভিজতে এলাম। তারপর নতুন ব্রিজ হয়ে শহরে।
আমাদের পুরো যাত্রাপথের সারমর্ম দাড় করালে হয় চট্টগ্রাম-রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবান-চিম্বুক-নীলগিরি-থানচি-আলীকদম-লামা-ফাইসসাখালি-চকরিয়া-চট্টগ্রাম।

Post a Comment

0 Comments